| |

কাঁচা চামড়া ঠেকাতে হাজারীবাগে পুলিশ, ব্যবসায়িরা আতঙ্কে

আপডেটঃ 3:04 pm | April 03, 2016

Ad

আলোকিত ময়মনসিংহ : ট্যানারি সরানোর জন্য বেঁধে দেয়া সময় পেরিয়ে যাওয়ায় এপ্রিল মাসের প্রথম দিন শুক্রবার থেকে হাজারীবাগ এলাকায় কাঁচা চামড়া প্রবেশ ঠেকাতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ফলে অন্যান্য দিনের মতো চামড়া প্রবেশ করেনি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা।

শুক্রবার রাতে হাজারীবাগ এলাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানিয়েছেন, চামড়া কারখানাগুলোতে মূলত রাত ১২টার পর থেকে মালামাল খালাসের কাজ শুরু হয়। তবে দিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ঠেলাগাড়ী দিয়ে চামড়া আসত। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে চামড়ার ট্রাকের বিশাল লাইন থাকলেও শুক্রবার সকালে দেখা যায়নি। তবে যেসব কারখানায় বৃহস্পতিবার ভোরের মধ্যে কাঁচা চামড়া প্রবেশ করাতে পারেনি সেগুলো কারখানার সামনে রাখা ছিল। কিন্তু পুলিশি তৎপরতার কারণে শুক্রবার সকালে চমড়াগুলো কারখানার ভেতরে নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। শনিবারও দেখা গেছে একই চিত্র।

ব্যবসায়িদের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেছেন, সরকার যে আলটিমেটাম দিয়েছিল তা বাস্তবায়ন হচ্ছে। এপ্রিল মাসের প্রথম দিন কারখানায় কোনো ধরনের কাঁচা চামড়া প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। যেসব চামড়া আগের দিনে কেনা ছিল সেগুলোও শুক্রবার থেকে হাজারীবাগের কারখানায় ঢুকানো হয়নি। অনেকটা পুলিশি হয়রানির ভয়েই কাঁচা চামড়া ঢুকানো হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তারা। তবে হাজারীবাগে না প্রবেশ করলেও পোস্তায় তা সাময়িক সময়ের জন্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।

এদিকে শনিবারও হাজারীবাগ এলাকায় দেখা গেছে, ট্যানারি সরানোর কাজ চলছে। হালকা ও ভারী যন্ত্রপাতি গাড়িতে তুলে সাভারের উদ্দেশে নেয়া হচ্ছে।

হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের জন্য একদিকে সরকারের আলটিমেটাম, পরিবেশ দূষণের কারণে হাইকোর্টের নির্দেশ এবং আন্তর্জাতিক চাপের কারণে এ শিল্প সাভারে স্থানান্তর করার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ধরে রাখার চেষ্টা। সব মিলিয়ে অস্তিত্ব সঙ্কটে আতঙ্কে আছে ট্যানারি মালিকরা।

তারা বলছেন, সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে ট্যানারি মালিকদের প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সেখানে সবাই যাবে কিন্তু যেভাবে সরকারের পক্ষ থেকে চাপ দেয়া হচ্ছে তাতে এ শিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ট্যানারি মালিক বলেন, চট্টগ্রামে যেসব কাঁচা চামড়া কেনা হয়েছে সেগুলো বৃহস্পতিবার রাতে হাজারীবাগের কারখানায় এসেছে। শুক্রবার সকালের মধ্যে সেগুলো কারাখানায় ঢুকানো হয়েছে। তবে কোনো কারখানার  সামনে শুক্রবার সকালে সেই চামড়া থাকলেও পুলিশের তৎপরতায় সেগুলো কারখানার ভেতরে নেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রতিদিন কাঁচা চামড়া কেনা হচ্ছে। সেগুলো হাজারীবাগের কারখানায় প্রবেশের সুযোগ না দিলেও সাময়িকভাবে পোস্তায় রাখা হচ্ছে।

বাংলাদেশে ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান (মিজান) বলেন, হাজারীবাগ থেকে সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে যাওয়ার প্রক্রিয়া শেষের দিকে। সেখানে কার্যক্রম শুরু করা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে যেসব ব্যবসায়ির কাঁচা চামড়া কেনা রয়েছে সেগুলো হাজারীবাগে প্রবেশ করতে দেয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

হাজারীবাগ ইব্রাহিম ট্যানারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, তাদের কিছু মালামাল বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম থেকে এসেছে। সব মালামাল রাতে কারখানায় প্রবেশ করতে পারেনি। ফলে কারখানার সামনে কিছু চামড়া রাখা ছিল। শুক্রবার সকালে পুলিশ এসে সেগুলো কারখানার ভেতরে ঢুকানোর জন্য ‍চাপ দেয়। পরে ভেতরে নিয়ে রাখা হয়েছে। তবে নতুন করে কেনা চামড়া হাজারীবাগ কারখানায় আনা হবে না বলেও জানান তারা।

লেদার হাইডস প্রতিষ্ঠানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের কারখানার ১২ হাজার চামড়া বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম থেকে কেনা হয়েছিল। রাতে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলেও মাল বোঝায় পরিবহণ পথে দুর্ঘনার কারণে তা সময়মতো কারখানায় এসে পৌঁছায়নি। সে চামড়াগুলো কাভার্ড ভ্যানের মাধ্যমে শুক্রবার রাতে হাজারীবাগের কারখানায় আনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, লাখ লাখ টাকার চামড়া তো আর সরকারের কথায় বাইরে ফেলে দেয়া যাবে না। আগে যেখানে উন্মুক্ত চামড়া আনা হতো এখন হয়তো সেটা না করে কাভার্ড ভ্যানের মাধ্যমে আনবে এবং কারখানার ভেতরে নিয়ে অফলোডের কাজটি করা হবে। আগে কারখানার সামনে রাস্তায় চামড়া রাখা হতো এখন থেকে সেটা আর করা হবে না।

এদিকে হাজারীবাগের চামড়া শিল্প প্রতিষ্ঠানের সামনে দিয়ে বারবার পুলিশ টহল দিতে দেখা গেছে। হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর আলিমুজ্জামান বাংলামেইলকে জানান, শুক্রবার সকাল থেকে হাজারীবাগে চামড়া প্রবেশ ঠেকাতে আজিমপুর মোড়, ঝিগাতলাসহ চারটি প্রবেশ মুখে পুলিশ চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। শুক্রবার সকালে দুই ঠেলাগাড়ি ভর্তি কাঁচা চামড়া হাজারীবাগে প্রবেশ করতে চাইলে পুলিশ চেকপোস্ট থেকে ফিরিয়ে দেয়া হয়।

উল্লেখ্য, উচ্চ আদালতের নির্দেশে পরিবেশ দূষণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার ২০০৯ সালে হাজারীবাগের চামড়া শিল্প স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়। এক হাজার ৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সাভারে চামড়া শিল্প নগরী স্থাপন করেছে সরকার। ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২৫০ কোটি টাকা অর্থিক সহযোগিতাও সরকারের পক্ষ থেকে করা হয়েছে ।

এদিকে চামড়া শিল্পকে পরিবেশবান্ধব করতে প্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতে ইউরোপীয় ক্রেতাদের দিক থেকেও ওই এলাকায় ট্যানারি কারখানাগুলো স্থানান্তরের চাপ রয়েছে। এমনকি পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত শিল্পের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে রফতানি নিষেধাজ্ঞারও আশঙ্কা রয়েছে। তাই ট্যানারী স্থানান্তর জরুরি বলে মনে করছে সরকার।এ কারণেই দফায় দফায় হাজারীবাগ থেকে ট্যানারীর কাযক্রম বন্ধ করার জন্য আল্টিমেটাম দিচ্ছে সরকার। শেষ চেষ্টা হিসেবে গত ২৯শে ফেব্রুয়ারি শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ট্যানারি স্থানান্তরে ৩১শে মার্চ পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিলেন মালিকদের। এপ্রিলের প্রথম দিন থেকে ঢাকার হাজারীবাগে কাঁচা চামড়া প্রবেশ করতে দেয়া হবে না বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।

ব্রেকিং নিউজঃ