| |

মনে তার নিত্য আসা-যাওয়া…

আপডেটঃ 7:09 pm | April 06, 2016

Ad

শিল্প ও বিনোদন ডেস্ক : বাঙালি মাত্রই গানটা মনে বাজে। মফস্বলের এক খোলা মাঠ, আঁকাবাঁকা সরু অথচ সুশ্রি এক রাস্তা, তার মাঝখান দিয়ে মন্থর গতিতে গাছপালা পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে একটা বাইক; আর বাইকে বসে বসে এক মায়াবী চেহেরার নারী-পুরুষ গাইছে, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলতো/ যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলোতো’।

এই গান দেখে শিহরিত হয়নি, রোমাঞ্চিত হয়নি এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুস্কর। যার ভেতরে নূন্যতম রোমান্টিসিজম নেই, তিনিও যদি শুধুমাত্র এই গানটি দেখেন, নিশ্চিত করে বলা যায় তার হৃদয় অন্তত একবারের জন্য হলেও মোচড় দিয়ে উঠবে। বহুবার, অসংখ্যবার এই গান শুনলে বা দেখলে সামান্যতম সময়ের জন্যও বিরক্তি আসে না। এ এক অদ্ভুত অসাধারণ আধুনিক বাঙলা গান!

সময় বয়ে যায়, দেশি-বিদেশি, নতুন আর পুরনো সিনেমা দেখি, নায়ক নায়িকাদের চিনতে থাকি; হঠাৎ একদিন ‘সপ্তপদী’ সিনেমাটা পেয়ে যাই। আপ্লুত হই, বিটিভির ছায়াছন্দের অনুষ্ঠানে দেখা সরু রাস্তার সেই মোটর বাইক ওয়ালা আর মায়াবী চেহেরার সেই নায়িকার ঠোঁটে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গাওয়া সিনেমাটা দেখার প্রবল আগ্রহের একটা সুরাহা হয়।

গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ জুটি উত্তম কুমার আর সুচিত্রা সেন অভিনীত ‘সপ্তপদী’ ছবিটি। ছবিটি দেখার পর মনে হয়, আহা, সম্পুর্ণ সিনেমা বলতে যা বোঝায় তা বুঝি এরকমই হওয়া উচিত। শুধুমাত্র একটা সাইট ভালো হলেই নয়, একটা কমপ্লিট সিনেমা সবদিকেই ভালো করবে, সপ্তপদী’র মতো। কি অভিনয়, গান, সংলাপ, দৃশ্য ধারণ আর ছবির গল্প; সব দিক থেকেই এক অসাধারণ মানের রোমান্টিক ছবি সুচিত্রার ‘সপ্তপদী’। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনী অবলম্বনে ষাটের দশকের শুরুর দিকে প্রখ্যাত নির্মাতা অজয় কর নির্মান করেন এই সিনেমা।

ষাটের দশকে নির্মাণ হলেও সপ্তপদী’র প্রেক্ষাপট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার। ভিন্ন ধর্মের দুই প্রেমিক-প্রেমিকার সামাজিক টানাপড়েন, বিবাদ, ধর্ম বিশ্বাস, অতঃপর ধর্মকে ছাপিয়ে প্রেমের জয়জয়কার সবই উঠে আসে সিনেমাতে।

এ্যাঙ্গলো ইন্ডিয়ান রীনা ব্রাউন(সুচিত্রা সেন) আর কৃষ্ণেন্দু(উত্তম কুমার) তারা একই মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করে। দুজন দুই ধর্মের মানুষ। কলেজে একদিন এ্যাঙ্গলো ইন্ডিয়ান ও ভারতীয়দের মধ্যে ফুটবল ম্যাচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। সেই খেলাকে কেন্দ্র করে রীনা ব্রাউনের সাথে চরম বাদানুবাদ ঘটে কৃষ্ণেন্দুর। দলবল পাকিয়ে যা তা একটা অবস্থা। কিন্তু এই বিরোধপূর্ণ অবস্থা তাদের মধ্যে বেশি দিন আর স্থায়ী হয় না। তারপর তাদের কলেজে আয়োজন করা হয় সেক্সপিয়রের নাটক ‘ওথেলো’ প্রদর্শনীর, আর তাতে কেন্দ্রিয় চরিত্রে অভিনয় করতে হয় কৃষ্ণেন্দু আর রীনা ব্রাউনকে। কলেজে এই নাটক মঞ্চস্থকে কেন্দ্র করে তারা পরস্পর কাছাকাছি আসে। তাদের মধ্যে তৈরি হয় ভালো লাগা। ভালো লাগা থেকে একসময় প্রেমে জড়িয়ে পড়ে ভিন্ন ধর্মের রীনা ব্রাউন আর কৃষ্ণেন্দু। তারা তাদের জাত-ধর্ম ভুলে ভাসতে থাকে প্রেমের হাওয়ায়। অজানা পথে হারিয়ে যেতে চায় তাদের মন। হারিয়ে যেতে যেতে তারা গুনগুনিয়ে উঠে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’।

সিনেমার মধ্য দিয়ে একটা ঘোরতর প্যারাডক্সও কিন্তু লক্ষ্য করি আমরা। এই যেমন, সিনেমার শুরুতে ধর্ম বিশ্বাসী রীনা ব্রাউনকে সিনেমার শেষে এসে ধর্ম আর ঈশ্বরে অবিশ্বাসী আর অন্যদিকে, ঈশ্বরে অবিশ্বাসী কৃষ্ণেন্দুকে শেষপর্যন্ত একেবারে আপাদমস্তক আস্তিক হিসেবে পাওয়া! সপ্তপদী সিনেমাটি শুধু কাহিনীর জন্য নয়, বরং অভিনয়ে যে সতস্ফুর্ততা আমরা সুচিত্রা এবং উত্তমের মধ্যে দেখি তা এই কালে এসেও প্রায় অসম্ভব। অভিনয় দিয়ে সুচিত্রা সপ্তপদী’তে এক মহান কীর্তীও গড়েছেন। ভারতীয় প্রথম কোনো অভিনেত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও আদায় করেছেন এই সপ্তপদী –তে অভিনয় করে। মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সিলভার প্রাইজ সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জেতেন তিনি।

বাংলা চলচ্চিত্র সম্ভারে তার অভিনীত ছবির সংখ্যা ৫৩। আর হিন্দিতে ৭। সব মিলিয়ে ৬০। এর মধ্যে ৩০টি ছবিই সুচিত্রা করেছেন উত্তমের সঙ্গে। ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘সবার উপরে’, ‘শাপমোচন’, ‘শিল্পী’, ‘সাগরিকা’, ‘পথে হলো দেরি’, ‘হারানো সুর’, ‘গৃহদাহ’, ‘প্রিয় বান্ধবী’ সহ আরো বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য এর মধ্যে। তাই সুচিত্রার কথা এলে উত্তম যেন প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন। উত্তম আর সুচিত্রা যেন চিরকালের এক জুটি।

১৯৬৩ সালে তার অভিনীত ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবি দিয়ে মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান সুচিত্রা সেন। এছাড়া ১৯৭২ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পদ্মশ্রী পান। ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বাংলাবিভূষণ সম্মাননা দেওয়া হয় তাঁকে। ২০০৫ সালে সুচিত্রা সেনকে ভারতের চলচ্চিত্র অঙ্গনের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব করা হলেও সুচিত্রা সেন দিল্লিতে গিয়ে ওই সম্মান গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

সর্বশেষ ১৯৭৮ সালে ‘প্রণয় পাশা’ ছবিতে অভিনয় করার পর হঠাৎই অন্তরালটা বেছে নিয়েছিলেন তিনি। ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি নিজেকে রেখেছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। যার অবসান হয় ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে। নীরবে নিঃশব্দে ৮৩ বছর বয়সে সকলকে কাঁদিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন তিনি। তবে মৃত্যুতেও শেষ হয়নি সেই রহস্যময় সুচিত্রার গল্প। মহাপ্রস্থানের পরও সবার মনে জায়গা পেয়েছেন তার সেই মন ভোলানো হাসি।

শুধু সিনেমায় নয়, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে সময়কে জয় করার জন্য প্রতিটি দশকে থাকে সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা শিল্পী। তার প্রতিভা আর মেধা দিয়ে তিনি অন্যদের থেকে এগিয়ে যান, সমকালিন সময়কে উতরিয়ে তিনি পৌঁছে যান অদূর ভবিষ্যতের কোনো জৌলুসময় গন্তেব্যে। তিনিই মহৎ শিল্পী। তারপর হয়তো সময়ই তাকে মহা নায়িকা, মহা শিল্পী, কিংবদন্তী ইত্যাদি নামে অবিহিত করে। বাংলার মহা নায়িকা খ্যাত সুচিত্রা সেনও তেমনি একজন। নিজের সৃজনক্ষমতায় অভিনয় দিয়ে তিনি শুধু তার সমকালিন সময়ের গন্ডিই অতিক্রম করেননি, বরং পৌঁছে গেছেন আরো দূর, বহুদূরের পথে। যে পথ সত্যি সত্যিই শেষ হওয়ার নয়।

মনে তার নিত্য আসা যাওয়া..

[আজ ৬ এপ্রিল মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের জন্মদিন।এ উপলক্ষে তার জন্মস্থান পাবনায় শুরু হয়েছে ৫ দিনব্যাপী ‘সুচিত্রা সেন চলচ্চিত্র উৎসব–২০১৬। উল্লেখ্য, উৎসবে প্রতিদিন সন্ধ্যায় শহরের মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল পৌর মুক্তমঞ্চে সুচিত্রা সেন অভিনীত চলচ্চিত্রের গান, আলোচনা সভা ও চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হবে।]

ব্রেকিং নিউজঃ