| |

হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবীবুর রহমানকে পরম শ্রদ্ধা

আপডেটঃ 7:54 pm | June 01, 2016

Ad

প্রদীপ ভৌমিক: আমাদের প্রিয় বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবীবুর রহমান আমাদের ছেড়ে গেলেন না ফেরার দেশে। আমরা হারালাম এক আজীবন মুজিব আদর্শের বিশ্বাসী মানুষকে। হারালাম মুক্তিযোদ্ধের চেতনা বিনষ্ঠকারীদের বিরুদ্ধের সংগ্রামী বীর সৈনিককে। শতভাগ অসাম্প্রদায়িক মানবিক গুণ সম্পন্ন ব্যাক্তিকে। মুক্তিযোদ্ধারা হারালো তাদের শুভাকাঙ্খী, অধীকার আদায়ের সংগ্রামের অগ্রসৈনিককে। ময়মনসিংহের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হারালো প্রিয় বন্ধুকে। বিপদ-আপদের সাথীকে।
স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী জনগন হারাল স্বাধীনতার চেতনাকে সমুন্নত রাখার সংগ্রামে লিপ্ত একজন স্বাধীনতা প্রেমিককে। তার মৃত্যুতে আমরা শোকে মুহ্যমান। তিনি এক বিরাট শুন্যতায় রেখে গেলেন আমাদের যা পুরণ হবার নয়। আমরা হয়ত বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবীব ভাইকে এ পৃথিবীতে আর ফিরে পাব না, কিন্তু তার আদর্শ চিন্তা চেতনাকে অবলম্বন করে এগিয়ে যাব আগামী দিনে। তার কর্মময় জীবনের স্মৃতিগুলি হয়ে থাকবে আমাদের প্রেরনার উৎস।
বঙ্গবন্ধুর ডাকে যখন বাঙ্গালীজাতি মুক্তিযুদ্ধে যাপিয়ে পড়েছিল সেই সময় স্বাধীনতা লাভের প্রচন্ড আকাঙ্খা থেকে বীরমুক্তিযোদ্ধা হাবীবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। তিনি ভারতের মেঘালয়ের তুরায় মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং ক্যাম্পে ট্রেনিং সমাপ্ত করে প্রত্য ভাবে সস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহন করে। সেই সময়টা জুন মাস।
১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি ময়মনসিংহ সাব সেক্টরে বিভিন্ন গুরুতপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্বে বিজয়পুর, চওরাপাড়া, ঘোষগাও, বিরিশিরি, জারিয়া, গোয়াতলা ও লিখালি কলসিন্ধুর প্রভৃতি বি ও পি ও অন্যান্য যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাথে প্রত্য ভাবে অংশগ্রহন করেন। তার সাহসিকতা ও উল্লেখযোগ্য কর্ম কান্ডের জন্য বাঘমারা সাবসেক্টরের ভারতীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডার শান্তাসিং তাকে প্রসংশা পত্র প্রদান করেন।
ময়মনসিংহের আওয়ামী রাজনীতির প্রবাদ পুরুষ বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্থ সহযোগী ভাষা সৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম রফিক উদ্দিন ভুইয়ার প্রিয় ব্যাক্তিদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন।
১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশে যে কয়জন সাহসিকতার সহিত প্রতিবাদ করেছিলেন তাদের মধ্যেও তিনি ছিলেন অন্যতম। আওয়ামী রাজনীতির যখন দুস্বময় অসংখ্য নেতাকর্মীরা যখন জেলে অথবা আত্মগোপনে সেসময় যে’কজন আওয়ামীলীগ নেতাকর্মী ময়মনসিংহ শহরে বঙ্গবন্ধু হত্যার নিন্দা জানিয়ে মিছিল করত হাবীব ভাই ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। তিনি কত বড় অসাম্প্রদায়িক ব্যাক্তি ছিলেন তার প্রমান আমাদের স্মৃতিতে আজও অম্লান। বাবরী মসজিদ নিয়ে তৈরি সাম্প্রদায়িক ঘটনার সময় হাবীব ভাইকে দেখেছি সারারাত লাঠি হাতে নিয়ে ঘুড়ে বেড়াতেন। জিজ্ঞেস করলে বলতেন মুক্তিযোদ্ধের সময় শহীদ হইনি আজ বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক তস্করদের প্রতিহত করতে গিয়ে যদি মৃত্যুবরন করি তাহলে ভাববো দেশের জন্য শহীদ হয়েছি।
৭১’র ১৬ ডিসেম্বর এর পরে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়েছে তখন পাকিস্তানী হানাদারদের দ্বারা তিগ্রস্ত মন্দির-মসজিদ পূনঃগঠনে হাবীব ভাই এর হস্ত ছিল প্রসারিত। প্রমান স্বরূপ উে ল্লখ করতে চাই বড়কালী বাড়ির কালী মন্দিরের নিরাপত্ত্বার জন্য তিনি গ্রিল তৈরি করে দিয়েছিলেন যার বিনিময়ে কোন অর্থ নেন নি, এমনি বিবিধ গুণের অধিকারী ছিলেন আমাদের প্রিয় বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবীব ভাই। আর একটি কথা উল্লেখ না করলে অকৃতজ্ঞ হয়ে থাকব- ময়মনসিংহে ৭৫ পরবর্তী সময়ে কেউ যখন আওয়ামীলীগকে অফিস করার জন্য স্থান দিতো না, হাবীব ভাই তার ব্যাবসায়ী প্রতিষ্ঠান সি.কে.ঘোষ রোডের পলি ইঞ্জিনিয়ারিং নামের দোকানটি ব্যাবসা বন্ধ করে দিয়ে আওয়ামীলীগকে অফিস করার জন্য ছেড়ে দিলেন। তিনি কত উঁচু মাপের ত্যাগী কর্মী ছিলেন আওয়ামীলীগের এটা তার প্রমান। তার মত আওয়ামীলীগের ত্যাগী ও নিঃস্বার্থ কর্মী খুব কম সংখ্যক চোখে পরে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবীবুর রহমানের জন্মস্থান বর্তমান কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার তেতুলিয়া গ্রামে। উনার পিতা ছিলেন মৌলবী আনসার উদ্দিন।
কর্মজীবনে বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবীবুর রহমান ময়মনসিংহ পৌরসভার ১৮০ আর.কে.মিশন রোডে স্থায়ী ভাবে Ÿসবাস করতেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনি ময়মনসিংহ পৌরসভার কমিশনার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি মুক্তিযুদ্ধা ও সাধারন মানুষের অত্যন্ত প্রিয় ব্যাক্তি ছিলেন। যে কোন সমস্যায় বিপদে বন্ধুর মত তাদের পাশে দাড়াতেন ও নিয়মিত খোজ খবর নিতেন। তিনি সর্বদায় স্বাধীনতার মুল্যবোধ ও চিন্তা চেতনার প্রাধান্য দিতেন, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও নির্যাতিতাদের প্রতি তার শ্রদ্বা ছিল অতুলোনীয়। প্রতি বৎসর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের প্রথম প্রহরে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ ও ময়মনসিংহ ডাকবাংলার পেছনের গন কবর সহ অপরাপর গণ কবর গুলিতে কিছুন নিরবে দাড়িয়ে থেকে শ্রদ্ধা জানাতেন। আমি আলোকিত ময়মনসিংহ পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন ঘটনা “ফিরে দেখা ৭১” শিরোনামে যখন লিখছিলাম তখন উনি প্রায় প্রতিদিন তিনি আমার পত্রিকা অফিসে আসতেন, আবেগ জরিত কন্ঠে বলতেন “তুমি নির্ভয়ে লিখে যাও মুক্তিযোদ্ধাদের কথা, এজন্য আমি তোমাকে অভিনন্দন জানাই। কোন প্রয়োজনে যদি আমার সাহায্যের দরকার পরে তাহলে আমাকে জানাবে।” তিনি বলতেন ‘তোমরা যদি না লেখ তবে মুক্তিযোদ্ধাদের কথা কে লিখবে… এটা তোমাদের কর্তব্য।’ তার সেই কথাগুলো আমাকে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের কথা লিখার প্রেরনা যোগাত। দৈনিক আলোকিত ময়মনসিংহ পত্রিকায় আমার মুক্তিযুদ্ধাদের নিয়ে প্রত্যেকটি লেখা উনি পড়তেন আর ধন্যবাদ জানাতেন।
আজ থেকে প্রায় দেড়মাস আগে উনি আমাকে ফোন করেছিলেন, উনি বলেছিলেন- আমি অসুস্থ, তুমি বাসায় এসো তোমাকে আমার শেষ কিছু বলার আছে কিছু মুক্তিযোদ্ধের ডকুমেন্ট দিতে চাই কিন্তু আমি এমন হতভাগা ব্যাক্তিগত ও পারিবারিক কাজের চাপে তার সাথে দেখা করতে পারিনাই জানতে পারিনি তার শেষ কথাটি। তবে উনি একটি কথা আমাকে বার বার বলতেন যারা স্বাধীনতা বিরোধী মুক্তিযোদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে না তাদের বিরুদ্ধে আর একটি যুদ্ধ করতে হবে। আমাদের ভিতরে লুকিয়ে থাকা জামাত শিবির চক্রের সহযোগীদের চিন্থিত করে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোদ গড়ে তোলতে হবে তা না হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হবে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবীব ভাই আপনি চলে গেলেন আমরা যারা মুক্তিযোদ্ধের পে লেখার চেষ্ঠ করি তাদের নি:স্ব করে দিয়ে। মুক্তিযোদ্ধের পে লেখার জন্য আপনার মত এত সাহস কেউ যোগায়নি আমাকে। হাবীব ভাই আপনাকে কথা দিলাম যতদিন আমি পত্রিকার সাথে যুক্ত থাকব ততদিন আপনার প্রদর্শীত পথ ধরে লিখে যাব মুক্তি যোদ্ধের প।ে আপনার উৎসাহ ও প্রেরনার মর্যাদা রা করব নির্ভয়ে। আপনার কাছথেকে আমি মুক্তিযুদ্ধের যে তথ্যগুলো পেয়েছি তা প্রকাশ করব পর্যায় ক্রমে। বীর মুক্তিযুদ্ধা হাবীবুর রহমান আপনি বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে চিরদিন। ফুল দিয়ে আপনাকে শ্রদ্ধা জানাইনি কিন্তু হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে আপনাকে জানালাম পরম শ্রদ্ধা।

ব্রেকিং নিউজঃ