| |

অসাধু চক্র গরু মোটাতাজাকরণের নামে মারাত্মক বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে

আপডেটঃ 1:09 am | August 22, 2016

Ad

এক্সকুসিভ: কোরবানি ঈদকে ঘিরে গরু মোটাতাজাকরণের নামে মোটা অংকের মুনাফা হাতিয়ে নিতে মাঠে নেমেছে অসাধু চক্র। তারা অবাধে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিক। আর এই অপকর্মের সাথে খোদ প্রাণিসম্পদ অধিদফতরেরই কতিপয় কর্মকর্তা জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। মূলত ওই অসাধু সরকারি কর্মকর্তারাই স্বল্পসময়ে গরু মোটাতাজাকরণের নামে খামারিদের হাতে তুলে দিচ্ছে মারাত্মক বিষ। অথচ তাদেরই দায়িত্ব গরু মোটাতাজা করায় বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার রোধে খামারিদের সতক করার। প্রাণিসম্পদ অধিদফতর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের অসাধু চক্রের সদস্যরা স্বল্পসময়ে কৃত্রিমভাবে গরু মোটাতাজাকরণের নামে ভয়ঙ্কর কমকা-ে জড়িয়ে পড়েছে। তারা খামারিদেরকে ঈদের কিছুদিন আগে রোগাক্রান্ত ও শীর্ণকায় গরুকে অল্প টাকায় কিনে হরমোন, ইনজেকশন ও রাসায়নিক ওষুধ প্রয়োগ করে গরু মোটাতাজাকরণে উদ্বুদ্ধ করছে। এর ফলে বেশি মুনাফার লোভে অসাধু ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত ডোজ ব্যবহার করে স্বল্পসময়ের মধ্যে শীণকায় ও রোগাক্রান্ত গরুকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বড় করে হাটে তোলে। ওসব গরু ঈদের এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে জবাই না করলেই মারা যায়। কারণ গরুর শরীরের পরতে পরতে ঢুকিয়ে দেয়া স্টেরয়েড, হরমোন কিংবা তার চেয়েও ভয়ঙ্কর রাসায়নিকের কারণে গরুর মৃত্যু হয়। ওসব গরুর মাংসে মানুষের লিভার, কিডনি, হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্তসহ মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার তীব্র আশঙ্কা থাকে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে- গরু নির্দিষ্ট ফর্মুলায় খাদ্য দিয়ে মোটাতাজা করলে মাংস ক্ষতির কারণ হয় না। তবে স্টেরয়েড দিয়ে মোটা করা গরুর মাংস জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
সূত্র জানায়, দেশে গরু মোটাতাজাকরণের ওষুধ নিষিদ্ধ হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলেও তা সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। আর অতি মুনাফার লোভে অসাধু ব্যবসায়ী বা খামারিরা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ওসব নিষিদ্ধ রাসায়নিক কিনে গরুর শরীরে প্রয়োগ করছে। এমনকি বাজারে মাত্র এক টাকায়ও গরু মোটাতাজাকরণের বিষাক্ত ট্যাবলেট পাওয়া যায়। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওসব ওষুধ বিক্রির নিয়ম না থাকলেও দেদারছে তা বিক্রি হচ্ছে। দেশীয় কোম্পানির পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ থেকেও পাচার হয়ে ওসব বিষাক্ত রাসায়নিক আসছে। ইতিমধ্যে বিজিবি দেশের বিভিন্ন সীমান্তপথে ওসব ওষুধের অন্তত ৩০টি অবৈধ চালান আটক করেছে। ওই ধরনের বিষাক্ত ওষুধে গরুর দেহে অধিক মাত্রায় পানি ধারণক্ষমতা হয়। তাতে গরুর শরীর ফুলে-ফেঁপে ওঠে, দুলদুলে ও স্বাস্থ্যবান দেখায়। তবে গরু দ্রুত মোটা হয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। গরুর কিডনির কার্যকারিতা কমে যায় এবং হৃৎপি- ও যকৃৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওসব গরুর মাংস মানবদেশের জন্যও মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনে।
সূত্র আরো জানায়, গরু মোটাতাজাকরণ একটি নিয়মিত ও প্রচলিত পদ্ধতি। তা একটি স্বল্পমেয়াদি লাভজনক পদ্ধতি। প্রাকৃতিক এই পদ্ধতিটি যুগ যুগ ধরে প্রচলিত। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে গরু মোটাতাজাকরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রাকৃতিক নিয়মে গরু মোটাতাজা করে হাজার হাজার বেকার যুবক স্বাবলম্বী হচ্ছে। কিন্তু দেশে পাবনা, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, ময়মনসিংহ ও ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোতে ক্ষতিকর নানা ওষুধ ও রাসায়নিক প্রয়োগের মাধ্যমে বেশি পরিমাণ গরু মোটাতাজা করা হয়। যদিও জনস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক গরু বাজারজাত রোধে ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে আগের চেয়েও বেশি সতর্ক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে এই বিষয়ে সভাও করেছে। তাতে বলা হয়- স্টেরয়েড ব্যবহার করে গরু মোটাতাজাকরণ নিয়ে জনমনে শঙ্কার প্রেক্ষাপটে কোরবানির পশুর গুরুত্বপূর্ণ হাটগুলোতে মেডিকেল টিম কাজ করবে।
এদিকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার সিন্ডিকেট স্বল্পসময়ে গরু মোটাতাজাকারণের নামে বিষাক্ত রাসায়নিক বিক্রি করে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার টার্গেট নিয়ে মাঠে নেমেছে। ওই সরকারি কর্মকর্তারা তাদের অধীন কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই সারাদেশে বিষাক্ত রাসায়নিক বিক্রির নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। সেজন্য অবৈধ কারখানায় গরু মোটাতাজাকরণের ভেজাল ওষুধ ও ইনজেকশন তৈরি করা হচ্ছে।  রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, খিলক্ষেত, রামপুরা, বাড্ডা, টঙ্গী, গাবতলী, সাভার, গাজীপুরের জয়দেবপুরে ওসব ওষুধ তৈরি করা হচ্ছে। তার বাইরে ময়মনসিংহ, যশোর, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, মেহেরপুর, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, খুলনা, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর ও মাদারীপুর এলাকাতেও ওই ওষুধ তৈরি করে বিক্রি করা হচ্ছে। ইতিপূর্বে একাধিকবার বিষাক্ত রাসায়নিকের অবৈধ ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের ওসব অসাধু কর্মকর্তাদের র‌্যাব আটক করে। এমনকি তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও ওই চক্রের দৌরাত্ম নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহারে গরু মোটাতাজাকরণ প্রসঙ্গে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক অজয় কুমার রায় জানান, কোরবানির গরু দ্রুত মোটাতাজা করতে কিছু অসৎ খামারি বিষাক্ত হরমোন ব্যবহার করছে। খামারিদের বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার না করতে সচেতন করা হচ্ছে। এবারও কোরবানির হাটে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পশু ঢোকানো হবে। যারা বিষাক্ত ওষুধ খাইয়ে গরু হাটে নিয়ে আসবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের বিষাক্ত রাসায়নিক বিক্রির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। কাউকে এসবের সাথে জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ব্রেকিং নিউজঃ