| |

ধরা পড়লো রিশার ঘাতক -মাহমুদুল বাসার

আপডেটঃ 4:22 pm | September 04, 2016

Ad

নামের সঙ্গে ‘খান’ উপাধি যুক্ত খুনি ওবায়দুল পালিয়ে আত্মরক্ষা করতে পারলো না। রিশা হত্যার এই বিকৃত প্রেম প্রত্যাশীকে নীল ফামারীর এক মাংস বিক্রেতা ধরিয়ে দিয়েছেন। মন থেকে তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। দেশপ্রেমিক নাগরিকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এর আগে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুর খুনি, এক জঙ্গিকে ধরিয়ে দিয়েছিলো হিজড়া লাবণ্য।
ধোপদূরস্ত-পালিশ করা ভদ্রলোকেরা এমন ঝুকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে না। তারা তামাশা দেখতে ভালবাসে। ঠোঁটের দায়িত্বটা তারা ঠিকমত পালন করে।
পুলিশ প্রশাসন মনে হয় তাৎক্ষণিক বুদ্ধি খাটিয়ে বলেছিলো যে, ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ঘাতক ওবায়দুলকে পাকড়াও করবে। কিন্তু তা পারেনি। মাংস বিক্রেতা দুলাল যদি পুলিশকে সময় মত খবর না দিতো তাহলে পুলিশ ওবায়েদকে এত সহজে ধরে কৃতিত্ব নিতে পারতো না। পত্রিকায় এসেছে, ‘প্রথমে র‌্যাব ও পুলিশ দু’পক্ষই ওবায়েদকে গ্রেফতারের দাবি করলেও পরে দু’পক্ষই বলে ডোমার থানা পুলিশ ও র‌্যাব তাকে গ্রেফতার করে।’ পত্রিকায় মাংস বিক্রেতা দুলালের জবানবন্দিও ছাপা হয়েছে। দুলাল বলেছেন, ‘সকালে বাজারে ওবায়েদকে ঘোরাঘুরি করতে দেখে সন্দেহ হয় আমার। পরে তাকে ডেকে সেখানকার এক চায়ের দোকানে বসিয়ে পরিচয় জানতে চাই। কিন্তু তার জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় ডোমার থানায় খবর দেই। পরে পুলিশ, ও র‌্যাব এসে তাকে ধরে নিয়ে যায়।’
সমাজের একজন সাধারণ মানুষ, একজন নিু পেশাজীবী তীক্ষè বুদ্ধি খাটিয়ে ওবায়েদকে ধরিয়ে দিয়েছেন। যাদের অস্ত্রের জোর নেই তাদের বুদ্ধির জোর থাকে। যাদের অস্ত্রের জোর থাকে কখনো কখনো তারা বুদ্ধির জোর ফেল করে।
ওবায়েদকে ধরতে না পারলে প্রশাসনের মুখ থাকতো না। আজকাল জনগন খুব স্পর্শকাতর। কথায় কথায় মানববন্ধন করে, প্রধানমন্ত্রীর দরবারেও রওয়ানা হয়। পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। এ প্রবণতাও লক্ষ্য করার মতো, সরকারি প্রশাসনকে প্রাপ্য প্রশংসা করে উৎসাহ দিতে চায় না কেউ। প্রশাসনের বিরুদ্ধে কেবলই আঙুল উঁচু করে রাখে। রিশার ঘাতক ধরা পড়ার পর এতে স্বস্তি প্রকাশ না করে নারী সংহতির নেত্রীদের হুমকি শুনে অবাক হলাম। তারা বলেছেন, ‘বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় বিচার না করে রাষ্ট্র-সরকার ধর্ষক-খুনিদের রক্ষা করছে এবং পৃষ্ঠাপোষকতা দিচ্ছে। ক্ষমতার ছত্রছায়ায় ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী আসফানা হত্যায় অভিযুক্ত ছাত্রলীগের নেতা রবীনকে পুলিশ আজও গ্রেফতার করেনি। আর সেনা নিবাসে তনু ধর্ষণ হত্যায় জড়িতদের ধরা ও বিচারের ক্ষেত্রে সরকার তামাশা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় দিনে-দুপুরে স্কুলে যাওয়ার পথে রিশাকে হামলা করে খুন করার মত স্পর্ধা দেখাতে পেরেছে যৌন নিপীড়ক ওবায়দুল।’ (সংবাদ- ৩/৯/১৬)।
নেত্রীদের গরম কথার মধ্যে পুলিশ সুপার বাবুলের স্ত্রী মিতু হত্যার কথা নেই। কেন? একজন সরকারি অফিসারের স্ত্রী বলে সে নারী ছিলো না? পুলিশ প্রশাসন সীমাবদ্ধতার উর্ধ্বে, এমন কথা বলে নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিতে চাই না। তাই বলে তার সরকার খুনি-ধর্ষকদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে? এমন ঢালাও অভিযোগ মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। রিশা হত্যার স্পটে সময় মতই পুলিশ প্রশাসন ছুটে গিয়েছিলো, প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ঘাতককে ধরা হবে। না হলে রাস্তা অবরোধ দীর্ঘ হোত, জনগণের দুর্ভোগ বাড়তো।
আমাদের সমাজ দুর্বৃত্তমুক্ত নয়। দুবৃত্তপনা উন্নত বিশ্বেও দেখা যাচ্ছে। দুবৃত্তপনারও আধুনিকয়েন ঘটেছে। সেখানে ঢালাও অভিযোগের গুরুত্ব কমই। শেখ হাসিনার সরকার ছাত্রলীগ ভিত্তিক নয়, জনগণ ভিত্তিক। ছাত্রলীগ সংগঠনের বিশাল বৃত্তে দুর্বৃত্ত থাকতে পারে। সেই দুর্বৃত্তদের শেখ হাসিনার সরকার পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে, এটা প্রমাণিত সত্য নয়, প্রমাণ সাপেক্ষে অনুমান নির্ভর কথা। বিশ্বজিৎ হত্যার দুর্বৃত্তদের বিচার করেছে এই সরকার। প্রতিদিনের পত্রিকায় আদালতের বিচারের রায়ের খবর আমরা পড়ে থাকি। ‘বিচারহীনতা’ কথাটা এ সরকারের বেলায় সবটুকু প্রযোজ্য নয়। সামগ্রিক ভাবে সমাজে খুন-ধর্ষণের প্রবণতা আছে। স্বয়ং গর্ভধারিণীও তার সন্তানকে হত্যা করে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে মানুষকে। নারী জঙ্গিদের ভয়ঙ্কর খবর পাচ্ছি পত্রিকায়। খুনিরা কেউ ধরা পড়ছে, কেউ পালাতে, আত্মগোপন করতে সক্ষম হচ্ছে। বিএনপি সরকার তাদেরই নেতা চট্টগ্রামের জামাল উদ্দিনকে ধরতে সক্ষম হয়নি। আওয়ামীলীগ সরকারও সাগর-রুনীর হত্যাকারীদের ধরতে সক্ষম হয়নি।
১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ২/৪ জন দুর্বৃত্ত লুকিয়ে থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে হিজড়া লাবণ্য, কসাই দুলালের মত কেউ দায়িত্ব পালন করলে খুনিরা আর পালাতে পারে না। অপরাধীকে ধরতে পারা প্রাথমিক সাফল্য। প্রাথমিক ভাবে স্বস্তিদায়ক। অপরাধীকে ধরতে সক্ষম না হওয়া দুশ্চিন্তার ব্যাপার সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য। কোনো খুনিকে যদি সরকার পৃষ্ঠাপোষকতা দিতে চায় তাহলে তাকে ধরে এনে জেলখানায় হেফাজতে রাখতে পারে। খুনিকে স্বেচ্ছায় গ্রেফতার না করার নির্বুদ্ধিতা সরকার করবে না। সরকার কোনো খুনিকে আড়াল করতে চায়, বাঁচাতে চায়, এর প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি মিডিয়ায়। তাছাড়া ওবায়েদের মত এক বিকৃত মনের কামুককে প্রশ্রয় দিতে যাবে কেন সরকার? বর্তমান ছাত্রলীগের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব আছে। তারা কাজের চেয়ে অকাজ করে বেশি। তাদের টেন্ডার বাজি আর চাঁদাবাজিতে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ। বলা চলে প্রশাসনের ওপর ছাত্রলীগের কোনো প্রভাব নেই। প্রধানমন্ত্রী বলে রেখেছেন, ‘অপরাধী যেই হোক, তাকে ছাড় দেয়া হবে না।’ কোনো অপরাধীকে ধরতে না পারলে প্রশাসনের দায় আছে, তাই বলে খুনী ধর্ষককে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে সরকার, এটা সমর্থন করার মত কথা নয়।
সরকার মানবতা বিরোধীদের বিচার করছে, সেখানে খুনি-ধর্ষকদের প্রশ্রয় দিতে পারে না, দিচ্ছেও না। আন্দোলন কারিরা একচেটিয়া মনগড়া কথা বলে কারো কোনো উপকার করতে পারবে না। খুনি-ধর্ষক সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা শানিত করা হলে কসাই দুলালের মত অনেক দায়িত্বশীলের জন্ম হবে, তাতেই লাভের অংক বৃদ্ধি পাবে। বর্তমান সরকারকে প্রতিপক্ষ করা হলে লাভ হবে কম। বর্তমান সরকারের বিবেক সচল আছে। অসাড় হয়ে যায় নি।
সরকার ও সামাজকে এক করে দেখলে চলবে না। সমাজে শিশুধর্ষণ, শিশু হত্যার ঘটনা ঘটে চলেছে। তারা অনেকে ধরা পড়েছে, তাদের বিচারও হচ্ছে। কিন্তু খুন-ধর্ষণ থেমে নেই। রিশা একটি জনপ্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী বলে আন্দোলন হয়েছে। কত রিশা অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে, কেউ খবর রাখে না। ব্যাপারটি আইনের শাসনের পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধেরও ব্যাপার ।
তাই রিশার খুনি ধরা পড়ার খবর একজন নাগরিক হিসেবে আমাকে স্বস্তি দিয়েছে। এরপর আমিও রিশার খুনির ফাঁসি চাই।

মাহমুদুল বাসার
কলাম লেখক, গবেষক।

ব্রেকিং নিউজঃ