| |

শহীদ কাদরী : আধুনিক নগর ভাবনার কবি

আপডেটঃ 8:56 pm | September 06, 2016

Ad

সফা হাসান::::::::::
না-ফেরার দেশে চলে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ‘তোমাকে অভিবাদন’-এর কবি শহীদ কাদরী। স্বদেশকে যিনি ‘প্রিয়তমা’ বলে সম্বোধন করেছেন। দুঃখিনী বাংলাকে অভয় দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা, ভয় নেই, এমন ব্যবস্থা করব…।’ নিউইয়র্কের নর্থ শোর বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ২৮ আগস্ট তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।
শহীদ কাদরী ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা শহরের পার্ক সার্কাসে জন্মগ্রহণ করেন এবং কলকাতা শহরেই শৈশব কাটান। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা শেষে ১৯৫২ সালের দিকে দশ বছর বয়সে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৭৮ সাল থেকে প্রবাসজীবন শুরু  করেন।
১৯৭১ সালে বিয়ে করার পর ভাগ্যের অন্বেষণে ১৯৭৮ সালে শহীদ কাদরী তাঁর প্রিয়তমা বধূকে সঙ্গে নিয়ে পাড়ি দেন বিদেশে। সুশ্রী হওয়ায় স্ত্রী পিয়ারী পেতে থাকেন নানা মডেল অফার। কবি এসব পছন্দ করতেন না। সেই থেকে সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। সংসার ছেড়ে কবি জার্মানও ছাড়েন। যান যুক্তরাষ্ট্রে এবং শুরু করেন নতুন জীবন। নতুন সঙ্গী হিসেবে বেছে নেন নিজের এক কবিতাপ্রেমীকে।
শহীদ কাদরীর প্রথম কবিতা ‘এই শীতে’ যখন বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৪। সে সময় কবিতা পত্রে কারও কবিতা ছাপা হওয়া মানেই ছিল তার কবি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া। ১৯৬৭ সালে ছাপা হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ উত্তরাধিকার।
বাংলাদেশের কবিতার উন্মেষের কালে পঞ্চাশে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হকসহ বেশকিছু কবির কবিতায় পূর্ববাংলার জল-হাওয়া-সংগ্রাম-ঐতিহ্যের আলোকে উদ্ভাসিত হয় বাঙালির ঐকান্তিক বোধের সামগ্রিকতা। বলতে হয়, আধুনিক নগর ভাবনার কবি শহীদ কাদরী ১৯৪৭ পরবর্তীকালে বাঙালি কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, যিনি নাগরিক-জীবন-সম্পর্কিত শব্দ চয়নের মাধ্যমে বাংলা কবিতায় নাগরিকতা ও আধুনিকতাবোধের সূচনা করেছিলেন। যে কারণে তিনি নগরচেতনার দিক থেকে বাংলা কবিতায় অন্যদের থেকে আলাদা। আবার এ কথাও সত্য যে, তাকে শুধু নগরচেতনার কবি বললে খ-িতভাবে মূল্যায়ন করা হয়। তার কবিতায় নাগরিক জীবনের বাইরেও বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ নিসর্গ, পশু-পাখি কিংবা লোকজীবনের নানা প্রপঞ্চেরও সন্ধান মেলে।
‘কবিতা, অম অস্ত্র আমার’ কবিতায় কবিতাকে শহীদ কাদরী নান্দনিক সৃষ্টিশীল অস্ত্র হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। কবিতার আত্মপ্রত্যয়ী অনুভবের মধ্যে কবি বীজ বপন করেছেন স্বদেশপ্রেমের। শামসুর রাহমান এবং শহীদ কাদরীকে নাগরিক কবি বলা হলেও এই দুই কবির কবিতায় প্রকৃতির ব্যাপক উপস্থিতি ল করা যায়। শামসুর রাহমানের কবিতায় এগুলো এসেছে বর্ণনার অনুষঙ্গ হিসেবে, কিন্তু শহীদ কাদরীর কবিতায় অনেক েেত্রই পশুপাখির প্রতীকী ব্যবহার লণীয়।
মটরের বনেট, পার্ক, সিনেমার কিউ, করাতকল, ল্যাম্পপোস্ট, কারফিউ, রেস্তোরাঁ, ট্রাফিক সিগন্যাল, ট্যাক্সি, ফুটপাত ইত্যাদি শব্দগুলোর সঙ্গে কবি একাত্মতা বোধ করেছেন তাঁর নাগরিক বোধ থেকেই। তবে এই নাগরিক বোধের একদিকে যেমন রয়েছে দীপ্র আধুনিকতা আবার এর উল্টো পিঠে তিনি অনেক নিঃসঙ্গ ও অসহায়। সেখানে শুধু নগর জীবনের রুগ্নতা, হীনতা, নিঃসঙ্গতা, কেদ আর শূন্যতার চিত্রÑ‘শহরের ভেতরে কোথাও হে রুগ্ণ গোলাপদল,/ শীতল, কালো, ময়লা সৌরভের প্রিয়তমা’ (আলোকিত গণিকাবৃন্দ)
কবির জন্ম, বেড়ে ওঠা, যৌবনের সমস্ত আয়োজনই ছিল শহরকেন্দ্রিক। আর সে কারণেই হয়তো তাঁর কবিতায় শহর এসেছে, শহরের মানুষের ভাবনা, মানসিক নানা পর্যায় এসেছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে- ‘আমি করাত-কলের শব্দ শুনে মানুষ।/ আমি জুতোর ভেতর, মোজার ভেতর সেঁধিয়ে যাওয়া মানুষ’ (এবার আমি)
১৯৭৪ সালে প্রকাশিত তাঁর দ্বিতীয় কাব্য তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা মূলত মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজবাস্তবতাকে ধারণ করেছে। তার এসব কবিতার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও জনপ্রিয় কবিতা ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’। এই কবিতায় স্বদেশভূমিকে প্রিয়তমা সম্বোধন করে কবি অঙ্গীকার করছেন ‘ভয় নেই/ আমি এমন ব্যবস্থা করব মুদ্রাস্ফীতি কমে গিয়ে বেড়ে যাবে/ শিল্পোত্তীর্ণ কবিতার সংখ্যা প্রতিদিন/ আমি এমন ব্যবস্থা করব গণরোষের বদলে/ গণচুম্বনের ভয়ে হন্তারকের হাত থেকে পড়ে যাবে ছুরি, প্রিয়তমা।’ এ কবিতায় দেখা কবির স্বপ্ন থেকে আমরা আজও অনেক দূরে রয়েছি। যুদ্ধোত্তর সময়ে দেশের দুর্ভি ও রেশনের দোকানের স্বজনপ্রীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধেও কবি কলম ধরেছেন। ‘নীল জলের রান্না’ কবিতায় বিভক্ত মানুষের রাজনীতি কবির চোখ এড়ায়নি। কবির তৃতীয় কাব্য কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই-এর অনেক কবিতায় তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের অনুরণন থাকলেও গ্রন্থটির বেশকিছু কবিতা পরিণত শিল্পসুষমায় ঋদ্ধ। এসব কবিতায় পশুপাখির আধিক্য চোখে পড়ার মতো। তাঁর শেষ কাব্য আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও-এর ৩৭টি কবিতার ৭টি কবিতাই পরবাসে ভ্রাম্যমাণ, অস্থির, অনিকেত অবস্থা থেকে স্বদেশ-স্বজনের দিকে ফিরে আসার আকুতিতে ভরা। একটি কবিতার অংশবিশেষ পাঠ করি : ‘কিন্তু আমি/ সেখানে আমার গাঁ কিংবা শহর/ কিংবা বাড়ি কিছুই এখনো খুঁজে পেলাম না। (নিরুদ্দেশ যাত্রা)
বাস্তবের সংঘাতে আহত কাদরী জীবনসঙ্গিনীকে সমস্যা, জটিলতা, অসহায়তার ইঙ্গিত দিয়েও বলছেন, ‘এখন তোমার সব দায়-দায়িত্ব আমাকে নিয়ে নিতে হবে, হবেইÑ।’ আবার দয়িতাকে না হারাতে চেয়ে লিখেছেন, ‘দাঁড়াও আমি আসছি/ তোমাকে চাই ভাসতে-ভাসতে/ ডুবতে-ডুবতে,/ ডুবে যেতে-যেতে আমার/ তোমাকে চাই।’
শহীদ কাদরী একজন বহুমাত্রিক ও বহুস্তরিক আধুনিক কবি। তাঁর শিল্পবোধ অনেকাংশেই পাশ্চাত্য শিল্পবোধের অনুগামী হলেও তিনি যে বাংলাদেশের কবি, তা তাঁর কবিতার সামগ্রিকতায় উদ্ভাসিত। তিনি তিরিশের আধুনিকদের সার্থক উত্তরসূরি। বোদলেরীয় বিবমিষা, অন্ধকার জগৎ, ফরাসি প্রতীকবাদীদের আলোকসঞ্চারী প্রভাব এবং ইউরো-আমেরিকান আধুনিক কবিদের ছায়াপাত সত্ত্বেও তাঁর কবিতায় শোনা যায় এক মৌলিক গুঞ্জরণ। বাংলা কবিতার একটি কালখ-ের ইতিহাসে কবি শহীদ কাদরীর নাম উচ্চারণ করতেই হবে, এ যেমন সত্যি, তেমনি সত্যি যে এমন কিছু কবিতার রচয়িতা তিনি, যে কবিতাগুলো বাংলা কবিতার বিপুল স্রোতোধারায় চিরকাল আপন মহিমায় ভাস্বর হয়ে থাকবে বলে আমার বিশ্বাস। মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এই কবি বাংলাদেশ ও বাঙালির অন্তর্জগৎ স্পর্শ করেছেন নিবিড়  মমতায়।
২০১১ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, মযহারুল ইসলাম কবিতা পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন খ্যাতিমান এ কবি।

ব্রেকিং নিউজঃ