| |

কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে পাটি শিল্প

আপডেটঃ 4:51 am | September 20, 2016

Ad

মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি: কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে মুন্সিগঞ্জ জেলরা সিরাজদিখান উপজেলার পাটি শিল্প। পাটি শিল্প বাংলাদেশের লোকাচারে জীবন ঘনিষ্ঠ ও ঐতিহ্যবাহী লৌকিক উপাদান। অতীতে গ্রামের বাড়িতে অতিথিরা এলে প্রথমেই বসতে দেওয়া হতো পাটিতে। গৃহকর্তার বসার জন্যও ছিল বিশেষ ধরনের পাটি। বর্তমানে হিন্দুদের বিয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ শীতলপাটি। গরমকালে শীতলপাটির কদর একটু বেশিই। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের দুপুরে এই পাটি দেহ-মনে শীতলতা আনে।

বেশ আগে দেখা যেত সিরাজদিখান উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে পাটিকরদের নান্দনিক কারুকার্য। এখন তা হারিয়ে যাচ্ছে। এখন শুধু বাপ দাদার ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার জন্যই এই শিল্পটিতে অনেকেই রয়েছে। বর্তমানে সিরাজদিখান উপজেলার ১৪৪টি পরিবার পাটি শিল্পকে তাদের বাঁচার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে আকড়ে ধরে রয়েছে। গৃহবধুদের হাতের ছোঁয়ায় নানা নকশায় উপজেলার ইছাপুরা ইউনিয়নের পশ্চিম রাজদিয়া, জৈনসার ইউনিয়নের ভাটিমভোগ, মালখানগর ইউনিয়নের আরমহল ও বয়রাগাদি ইউনিয়নের পাউলদিয়া গ্রামে তৈরি করা হয় শীতল পাটি। পাটি বড় চট, ছোট চট প্রভৃতি।

রপ্তানি পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি না পেলেও শৌখিন ব্যবসায়ী, বেড়াতে আসা অতিথিদের মাধ্যমে শীতলপাটি যাচ্ছে কলকাতা, মধ্যপ্রাচ্য, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে। অনেকে আবার নকশা করা শীতলপাটি দেয়ালে টাঙিয়ে রাখেন বসার ঘরের শোভা বাড়াতে। পাটি তৈরি শিল্পীরা নিজেদের স্বপ্নের পাশাপাশি গ্রামের অন্য নারীদের পাটি তেরির প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মাঘ-ফাল্গুন হচ্ছে পাটি বুনার উত্তম সময়। আর বৈশাখে সেই পাটির চাহিদা থাকে ব্যাপক। বছরে ২-৩বার সিলেট থেকে পাটির কাঁচামাল বর্ষজীবী উদ্ভিদ ‘মোতরা’ বা ‘পাইত্রা’ আসে। এছাড়া মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর, টঙ্গিবাড়ি, লৌহজং উপজেলাসহ সিরাজদিখান উপজেলার ইছাপুরা, কুসুমপুর, চন্দনধূল, আবিরপাড়া গ্রাম ও সিরাজদিখানের হাট থেকে কিনে আনা হয়। গ্রাম থেকে ১পোজা পাইত্রা/মোতরা ৫০-১০০টাকা আর সেই পাইত্রা/মোতরা হাট থেকে ৩০০-৩৫০ টাকায় কেনা হয়। ১পোজা পাইত্রা/মোতরা দিয়ে ১টি পাটি হয়। ওই পাটিটি ৫০০-৫৫০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। পাটির সাইজ অনুযায়ি বুননি মজুরী হয়ে থাকে। ৩হাত বাই ৪হাত ৯০টাকা, সাড়ে ৩বাই সাড়ে৪ হাত ১২০টাকা ও ৪হাত বাই ৫হাত ১৪০টাকা। মান অনুযায়ী প্রতিটি পাটি বুনতে ২-৬ দিন লেগে যায়। উন্নত মানের পাটিকে ডালার বলা হয়। এটি বুনতে ৯-১০দিন লেগে যায়। ১টি পাটিতে বুননি খরচ হয় ৬০০টাকা। পাইকারি বাজারে এর মূল্য ২৫০০-৩০০০টাকা। এজেলার পাটি বিক্রির অন্যতম বাজার টঙ্গিবাড়ি উপজেলার বেতকা ও আব্দুল্লাপুর। এ হাটে ঢাকা, ফরিদপুর, চাঁদপুর, নারায়নগঞ্জ ও নরসিংদি থেকে পাইকাররা পাটি কিনতে আসে। এছাড়া স্থানীয়ভাবে ও সিরাজদিখান বাজারেও বিক্রি করা হয়।

সিরাজদিখান উপজেলার ভাটিম ভোগ গ্রামের পাটিকর অতুল দে(৬০) জানান, আমি ছোট থেকেই এ কাজ করে আসছি। আমার ১ছেলে ও ২মেয়ে নিয়ে খুব একটা ভাল নেই। কারন জানতে চাইলে সে বলেন, আমাদের পূর্ব পরুষের আমলে পাটির যে পরিমান চাহিদা ছিল তা আর সে রকম নেই বললেই চলে। সে সময় পাটির চাহিদা ছিল ব্যাপক এবং আমরা পাটি বিক্র করে অনেক টাকা উর্পাজন করেছি। এতে আমাদের সংসার খুব ভালবাবে চলতো। কিন্তু বর্তমানে পাটির চাহিদা না থাকায় আমার মতো অনেক পাটিকরের পরিবার কষ্টে জীবন জাপন করছে।

এই ব্যাপারে পশ্চিম রাজদিয়া গ্রামের মনিন্দ্র চন্দ্র দে বলেন, আমরা ৪ভাই বাকি ৩ভাই এ কাজে জড়িত। আমাদের বুঝ জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই এ কাজ করে আসছি। আমাদের সংসার এ দিয়ে কোনভাবে চলছে। গ্রামের বিয়েতে পাটির খুব চাহিদা রয়েছে। বাড়িতে এসেই তারা নিয়ে যায়। সরকার আমাদের সহযোগিতা করলে আমার মতো অনেক পরিবার এ শিল্পটাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে।

পশ্চিম রাজদিয়ার মায়ারাণী দে, ইতি, শোভা দে, অর্চনা দের মতো সিরাজদিখানের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকশ নারী রয়েছে যারা পাটি বিক্রি করে সংসারের বাড়তি খরচের যোগান দেন। তারা নিজেদের পাশাপাশি এলাকার বেকার অন্য নারীদেরও স্বাবলম্বী হবার স্বপ্ন দেখান। পাটিশিল্পের বিকাশে বড় সমস্যা একটি হলো অর্থনৈতিক সমস্যা। শীতলপাটি তৈরির জন্য পাটি শিল্পীদের সরকারি, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কোনো ঋণ দেয় না। সরকার শীতলপাটি রপ্তানির উদ্যোগ নিলে পাটি শিল্পীদের দুংখ কিছুটা লাগম হতো।

ব্রেকিং নিউজঃ