| |

মনের হুকুমে চলবে কম্পিউটার

আপডেটঃ 12:56 am | October 09, 2016

Ad

‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একদিন মানবজাতির ধ্বংস ডেকে আনবে’ বলে ক্রমাগত সতর্ক করে যাচ্ছেন হুইলচেয়ারবন্দি ব্রিটিশ জ্যোতিপদার্থবিদ স্টিফেন হকিং। কিন্তু তার কথা কে শোনে!

থেমে থাকছে না রোবট আর আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এরই মধ্যে মানুষ এমন রোবট বানিয়ে ফেলেছে যে রোবট কথা বলতে পারে, ঘরদোর পাহারা দিতে পারে, চা-কফি বানাতে পারে, গান গেয়ে শোনাতে পারে, বাচ্চাদের মতো কাঁদতে পারে, ছবি আঁকতে পারে।

এখানেই শেষ নয়, রোবট এখন মানুষের মৌখিক আদেশ বুঝে তা পালনও করে। কিছু রোবট আবার চোখের ইশারায় চলে।

উল্টোটাও হচ্ছে, ঘটছে।বছরখানেক আগে মার্কিন এক গবেষণাগারে তৈরি রোবট বিজ্ঞানীদের দেয়া মৌখিক আদেশের বিরোধিতাও করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জোরে সে বুঝতে পেরেছে ওই আদেশটি পালন করলে সে নিজে ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই সে তার যান্ত্রিক কণ্ঠস্বরে বিজ্ঞানীদের জানিয়েছে, এই আদেশ মানলে সে ধ্বংস হয়ে যাবে; সেহেতু এহেন আদেশ সে মানবে না। রোবটের এই ‘রোবোটামি’ বিজ্ঞানীদের রীতিমতো হতবাকই করেছে।

এছাড়া কিছুদিন আগে জার্মানির একটি কারখানায় একটি অবাধ্য রোবট এক কারখানাকর্মীকে গলা টিপে হত্যা করেছে। সেই দুনিয়াজোড়া সংবাদমাধ্যমে এসেছেও ফলাও করে।

যাহোক, এবার রোবট আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবার পথে। বোরট এবারমুখের কথায় বা চোখের ইশারায় নয়, বরং মানুষের মনের হুকুমে চলবে। এমন রোবট তৈরিও করে ফেলেছেন রাশিয়ার একদল বিজ্ঞানী। তারা সফল ট্রায়ালও দিয়ে ফেলেছেন এর।

রাশিয়ার সফটওয়্যার কোম্পানি নিউরোবোটিক্স (Neurobotics) এই রোবটের নির্মাতা। তারা এমন এক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের দোরগোড়ায়, যে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষ মনের আদেশে কম্পিউটার চালাতে পারবে। সেই সঙ্গে চালাতে পারবে রোবোটিক প্রসথেটিক্সসহ (robotic prosthetics) কম্পিউটারের সাহায্যনির্ভর প্রযুক্তিও (computer-assisted technologies)। মানে দাঁড়াচ্ছে, প্রায় সব ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্রই চালানো যাবে মনের আদেশে।

সম্প্রতি বিশ্বের প্রথম বায়োনিক অলিম্পিক (‘the World’s First Bionic Olympics’) নামে পরিচিত অ্যাসিসটিভ টেকনোলজি প্রতিযোগিতা Cybathlon—এর সাইড লাইনে LifeNews নিউরোবোটিক্স-এর প্রধান নির্বাহী ভ্লাদিমির কোনিশেভের এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার নেয়।

তিনি তার কোম্পানির উদ্ভাবিত অভিনব এই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। বহু বছর ধরে brain-computer interface নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। সফলতার দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছে এবার তারা একটি নিউরো-হেড সেট তৈরি করে এর ক্ষমতাকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাবার পথে। এই নিউরো-হেড সেটটি এমন এক যন্ত্র, যা মস্তিষ্কের (গ্রে ম্যাটার)সিগন্যাল বুঝে তা কম্পিউটারে প্রেরণ করবে। আর কম্পিটারটি নিজেকে এবং নিজের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন যন্ত্রকে সে অনুযায়ী পরিচালিত করবে।

Cybathlon-নামের এই প্রতিযোগিতাটি শুরু হয়েছে শনিবার, সুইজারল্যান্ডের জুরিখে। এটি মূলত শারীরিক প্রতিবন্ধী বা পঙ্গু অ্যাটলেটদের নিয়ে আয়োজিত এক প্রতিযোগিতা, যারা সর্বাধুনিক অ্যাসিসটিভ ডিভাইসের সাহায্য নিয়ে খেলবেন।

LifeNews-এর কাছে কোনিশেভ দাবি করেন, তাদের উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা সীমাহীন। উদ্ভাবিত নিউরো-হেডসেটটির প্রযুক্তিগত তেলেসমাতির কিছু দিকও তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে ব্যাপারটা এখন নিরীক্ষার কোন পর্যায়ে আছে, তিনি  তা-ও ব্যাখ্যা করেন।

কোনিশেভ বলেন, এই নিউরো-হেডসেটটিতে রয়ে এম্বেডেড ইলেকট্রোড (embedded electrodes)সম্বলিত একটি নিউরোপ্রেন ক্যাপ হেলমেট (neoprene cap-helmet)।

ব্লুটুথের মাধ্যমে ডাটা প্রেরণের জন্য হেলমেটটির পেছন দিকটায় আছে একটি বায়ো এমপ্লিফায়ার (bio-amplifier)। এ ধরনের হেডসেট ব্যবহার করে থাকে ইলেকট্রোডস। ওই ইলেকট্রোড আবার বৈদ্যুতিনভাবে পরিচালনযোগ্য এক ধরনের জেল ব্যবহার করে। তবে এই জেলটা ব্যবহারকারীর ওপর প্রয়োগ করার জন্য অন্য কারো সাহায্য লাগবে। কোনিশেভের ভাষায়: ‘‘আসল চ্যালেঞ্জটা এ নিয়েই। মানে হচ্ছে, an assistant is required’’।

দ্বিতীয় ধাপে এসে এখন তাদেরকে এমন এক নিউরো-হেডসেট তৈরি করতে হবে যাতে থাকবে ‘ড্রাই ইলেকট্রোড’ (dry electrodes।

কোনিশেভ আশা করছেন, আগামী বছরেই তারা তা করে ফেলতে পারবেন।

তেমন একটিনিউরো-হেড সেট তৈরি করার অর্থ হচ্ছে, অন্য কারোর সাহায্য ছাড়াই লাখ লাখ মানুষ হ্যান্ডহেল্ড মোবাইল সেটের মতোই ব্রেইন কম্পিউটার ইন্টারফেসটি অনায়াসে ব্যবহার করতে পারবে।

ল্যাবরেটরিতে কেবল নয়, মানুষ তা ঘরে বসেই যখন-তখন ব্যবহার করতে পারবে। এটির তাদের জন্য হবে বিনোদনের এক বড় উপলক্ষ্য। ডিভাইসটি হবে মানুষের নিত্য সঙ্গী।

“নিউরো-হেডসেটটি হবে তারবিহীন। এতে খুব কম সংখ্যক চ্যানেল, যাতে রোবোটিক এই যন্ত্রটিকে মানুষ চলাফেরার সময়ও ঝামেলাহীনভাবে ব্যবহার করতে পারে। হোক তা ডানাযুক্ত বা চাকাযুক্ত রোবট।’’

শুধু কি সুস্থ সক্ষম মানুষ? না, যারা পঙ্গু বা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী তারাও এটি ব্যবহার করে সুস্থ-সবল মানুষের মতোই অনেক কিছু করতে পারবেন। মেন্টাল কমান্ড বা মনের আদেশটি কিভাবে দিতে হবে সেটা তাদের শিখিয়ে দিলেই কেল্লা ফতে!

“এটা শিখতে তাদের বড়জোর ৩০ থেকে ৩৬ মিনিট লাগবে। মনের আদেশে স্মার্টফোন বা কম্পিউটার চালানো বা কম্পিউটার গেম খেলার জন্য এটুকু প্রশিক্ষণই যথেষ্ট হবে। তবে মনের আদেশে চার পাখাঅলা কপ্টার (quadrocopters) বা জটিল যন্ত্র চালানোর জন্য একটু বেশি সময় প্রশিক্ষণ নিতে হবে। জানালেন কোনিশেভ।

যেসব মানুষ মোটর নিউরন রোগের মতো জটিল স্নায়ুরিক রোগে ভুগছেন, এরকম মানুষের জীবনকেও সচ্ছন্দ ও আরামপ্রদ করতে এই প্রযুক্তি বিপ্লব ঘটিয়ে দেবে। যারা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পুরোপুরি শয্যাশায়ী তারাও স্মার্টফোনসহ যেকোনো ডিভাইস ব্যবহার করতে পারবেন অনায়াসে।

“আমরা ভিডিওতে দেখিয়েছি একজন মানুষ মনের আদেশে কি করে তার হাতের সঙ্গে যুক্ত এক্সোস্কেলিটনকে (দেহের বাইরে সংযুক্ত এক ধরনের কৃত্রিম কংকাল) একজন সুস্থ-সবল মানুষের মতো যেমন ইচ্ছে নাড়াতে পারছেন।’’—বললেন কোনিশেভ।  (ভিডিওটি দেখুন)।
ঘরের টিভি বা কম্পিউটার, এয়ারকন্ডিশনার বা যে কোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্রকে দূর থেকে মনের আদেশে নিয়ন্ত্রণও করা যাবে এই ডিভাইসটি দিয়ে।

আর যারা পুরোপুরি পক্ষাঘাতগ্রস্ত তারা তাদের হুইল চেয়ারটিকে মনে মনে যা বলবেন, সেটি তাই করবে। নিউরো-হেডসেটটি এভাবেই দেখাবে নানা কেরামতি।

এখানেই শেষ নয়, ব্যবসার নানা কাজে, হাসপাতালের জটিল অস্ত্রোপচার, রোগীর যত্ন-আত্তি এবং স্কুলে পাঠদানসহ হাজারো কাজে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়ে দেবে ‘সকল কাজের কাজী’ এই নিউরো-হেডসেট।

মানে, সম্ভাবনার শুরু আছে, শেষ নেই।

ব্রেকিং নিউজঃ