| |

মুক্তিযুদ্ধে এফ জে সাব সেক্টরের অধিনায়ক রফিক উদ্দিন ভুইয়া ময়মনসিংহবাসীর কাছে তোমার স্মৃতি চিরঅম্লান

আপডেটঃ 11:42 am | March 23, 2017

Ad

প্রদীপ ভৌমিক ॥ ‘৫২র মহান ভাষা আন্দোলন, ‘৬৬র ঐতিহাসিক ৬ ও ১১ দফা আন্দোলন, এবং ১৯৭০ এর নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠ আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করার পর ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দিকনিদের্শনা মূলক ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষনের মধ্য দিয়ে ময়মনসিংহের সংগ্রামীজনতাও ঐক্যবদ্ধ ভাবে ঝাপিয়ে পড়েন মহান মুক্তিযুদ্ধে।

৭ই মার্চের ভাষনে বঙ্গবন্ধু সুস্পষ্ট ঘোষনা দেন “ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তুল, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন।

পাকিস্তান সামরিক সরকার বাঙ্গালী জাতির প্রাণ প্রিয় অবিসংবাদিত নেতার নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ২৫শে মার্চ/৭১এর কাল রাত্রিতে নিরস্ত্র বাঙ্গালী জাতির উপর ঝাপিয়ে পড়ে।

পাকহানাদার বাহিনী চালায় নারকীয় গনহত্যা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ইপি, আর এর ওয়্যারলেস এর মাধ্যমে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষনা দেন। শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ময়মনসিহের সংগ্রামী জননেতা ভাষা সৈনিক রফিক উদ্দিন ভূঞার নেতৃত্বে ও নির্দেশে ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় এলাকায় সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়।

ময়মনসিংহ জেলা সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগে সিটি স্কুল ও মহাকালী স্কুলে নিয়ন্ত্রন কক্ষ গড়ে তুলে পাশ্ববর্তী এলাকা ও মহকুমার সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠে। প্রধান নিয়ন্ত্রন কক্ষ ছিল মোহাম্মদ আলী রোডস্থ জননেতা রফিক উদ্দিন ভুইয়ার বাসভবনে।

আজকের ধর্মমন্ত্রী পরবর্তীতে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারতের ঢালু ইয়ুথ ক্যাম্পের ইনচার্জ অধ্যক্ষ মতিউর রহমান সাহেব সেই নিয়ন্ত্রন কক্ষ থেকে প্রাপ্ত খবরা খবর রফিক উদ্দিন ভুইয়া সহ অপরাপর তৎকালীন আওয়ামীলীগ নেতাদের অবহিত করতেন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবর্তমানে ১৭ই এপ্রিল গঠিত স্বাধীন বাংলা মুজিব নগর সরকার কর্তৃক পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধে ময়মনসিংহ জেলা ১১নং সেক্টরের অধীন ছিল।

ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোণা, টাংঙ্গাইল, সুনামগঞ্জের পশ্চিমাঞ্চল ও কুড়িগ্রাম জেলার যমুনার পূর্ববর্তী অঞ্চল নিয়ে ১১নং সেক্টর গঠিত হয়। এটি ছিল বড় সেক্টর এবং সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু তাহের। আবার নালিতাবাড়ী, হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, দূর্গাপুর কলমাকান্দা সীমান্ত অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় এফ.জে সাব সেক্টর। বিশেষ করে ময়মনসিংহ জেলা এ সাব সেক্টরের অধীন ছিল এবং এর অধিনায়ক ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিক উদ্দিন ভূঞা।

তার সুযোগ্য নেতৃত্বে এ অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথা যুদ্ধ ও অনেক রক্ত ত্যাগের বিনিময়ে ১০ ডিসেম্বর/৭১ ময়মনসিংহ শত্রুমুক্ত হয়।

মহান স্বাধীনতা উত্তর মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক কর্ণেল এম.এ.জি আতাউল গনী ওসমানী স্বাক্ষরিত মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে বিতরনকৃত সনদপত্রে আঞ্চলিক অধিনায়ক হিসাবে বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিক উদ্দিন ভূঞা যুক্ত স্বাক্ষর করে ছিলেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিক উদ্দিন ভূঞার অবদান স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে।

রফিক উদ্দীন ভূঁইয়া ছিলেন ভাষা সৈনিক ও ’৭১-এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ময়মনসিংহ অঞ্চলের অন্যতম সংগঠক। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ঘনিষ্ঠ সহচর ৬দফা আন্দোলনের বিপ্লবী নেতা রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া নান্দাইল উপজেলার মেরেঙ্গা গ্রামে ১৯২৮ সালের ২৫ জানুয়ারি জন্ম গ্রহণ করেন।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর তত্ত্বাবধানে ময়মনসিংহ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হয়ে অংশ নেন। এর আগে ১৯৫২ সালে মহান ভাষা আন্দোলনের বীর সৈনিক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন।

সে সময় তিনি ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৩ সালে রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া নান্দাইল থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

তিনি দীর্ঘকাল ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ওয়াকিং কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহ জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

সাদামাটা জীবন ও নীতিবান মানুষ হিসেবে পরিচিত জননেতা রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া ১৯৯৬ সালের ২৩ মার্চ বার্ধ্যক জনিত কারণে ইন্তেকাল করেন। ভাষা সৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া নান্দাইল সদরে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯৭২ সালে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় শহীদ স্মৃতি আদর্শ (বর্তমানে ডিগ্রি) কলেজ প্রতিষ্ঠাতা করেন। তিনি ১৯৭৩ ও ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।

দীর্ঘদিন ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ওয়ার্কিং কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। ময়মনসিংহের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন প্রবাদ পুরুষ। উনার মত নির্লোভ ও ত্যাগী আওয়ামীলীগের নেতা দ্বিতীয়টি আজ পর্যন্ত নেই।

এই মহান নেতা আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন চিরদিন। তিনি স্মৃতিতে অম্লান ও চিরভাস্বক। (তথ্যসুত্র: বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব, সাবেক কমান্ডার, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।)

ব্রেকিং নিউজঃ