| |

মৌলবাদ,জঙ্গি ও দুষ্কৃতিকারিদের হামলার ভয়ে সময়ের শৃঙ্খলে বেধেঁ কাল বরণ করা হবে বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখকে

আপডেটঃ 2:12 pm | April 14, 2017

Ad

প্রদিপ ভৌমিক: রাত পোহালেই পহেলা বৈশাখ। বাংলাদেশের সমতল ও পাহাড়ী জনগোষ্টির জীবনে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে এই দিনটি। বাংলাদেশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠির প্রাণের উৎসব এই পহেলা বৈশাখ । বছরের এই দিনটিতে বাঙ্গালীর পুরাতন বছরের দেনা পাওনার হিসাব মিটিয়ে শুরু করে নতুন দিনের পথযাএা।

পহেলা বৈশাখের প্রথম দিনটিকে অবলম্বন করে বাংলাদেশের মানুষ সমস্ত প্রকার গ্লানি ব্যর্থতা ভুলে গিয়ে আগামী দিনের আনন্দময় যাএা শুরু করার জন্য মেতে উঠে উৎসবের আনন্দে। ভুলে যায় জীবনের দু:খ ও বেদনাকে। বৎসরের শেষ দিন ৩০ চৈএের মধ্যে বাঙ্গালী ব্যবসায়ীরা তাদের গ্রাহক ও পাওনাদারদের সাথে দেনা পাওনার হিসাব নিকাশ শেষ করে ফেলে।

পহেলা বৈশাখের দিন সকাল থেকে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান,কুশল ও মিষ্টি  বিনিময় করে গভীর রাত পর্যন্ত চলে বাঙ্গালীর কৃষ্টি ও সাংস্কৃতির অনুষ্ঠান। যুবক বৃদ্ধ থেকে শুরু করে নারী পুরুষ ও শিশুরা নেচে গেয়ে আনন্দের জোয়ার বয়ে দেয় তাদের জীবনে। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, থেকে শুরু করে সমস্ত জাতীস্বওা যেন এক মোহনায় এসে মিলে মিশে সর্ব প্রকার ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একাকার হয়ে যায়। থাকেনা কোন ধর্মীয় বিভাজন।

তৈরি হয় এক জাতির এক দেশ বাঙ্গালীর বাংলাদেশ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাই “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো” বলে আহ্বান করে ছিলেন বাঙ্গালী জাতির জীবন থেকে দু:খ বেদনা ও জরাজীর্ণ মুছে ফেলার জন্য।
বাঙ্গালীর জাতিয় জীবনে পহেলা বৈশাখ এক অপরিহার্য দিন। অনন্তকাল ধরে বাঙ্গালীরা এই দিনটিতে ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এক জাতি হিসেবে নিজেদেরকে উপস্থাপন করে। শপথ নেয় সাম্প্রদায়িকতা, স্বৈরাচার, সামাজিক ও ধর্মীয় বিভেদের বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশের সমতল কিংবা পাহাড়ী জাতিগোষ্ঠি যখন ব্যাস্থ জাতির এই প্রাণের উৎসবকে বরন কওে নিতে ঠিক সেই মুহুর্তে বাংলাদেশের স্বরাষ্টমন্ত্রীর উৎসব নিয়ে কিছু ঘোষনা আমাদেরকে বিব্রত করেছে। স্বরাষ্টমন্ত্রী ঘোষনা করেছেন, বিকেল ৫টার মধ্যে প্রকাশ্য স্থানে শেষ করতে হবে পহেলা বৈশাখের সব আয়োজন। মঙ্গল শোভাযাএায় ব্যবহার করা যাবেনা কোন মুখোশ।

তবে মুখোশ বহন করে নিয়ে যাওয়া যাবে।বাজানো যাবে ঘু ঘু জেলা বাশিঁটি। স্বরাষ্টমন্ত্রীর এ ঘোষনায় মনে হয় উৎসবে মৌলবাদী ও জঙ্গীরা যাতে কোন প্রকার অঘটন ঘটাতে না পারে তার জন্যই এই সিদ্ধান্ত। তবে স্বরাষ্টমন্ত্রীর সাথে একটি বিষয়ে আমরা একমত আফ্রিকার আনন্দ উৎসবে ব্যবহৃত ঘুঘু জেলা বাঁশির তীব্র আওয়াজ শুভ যাএায় অংশগ্রহন কারিদের মধ্যে বিরক্তির সৃষ্টি করে।

সব ধর্মের বাঙ্গালীরা সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজ নিজ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পহেলা বৈশাখের শুভ সূচনা করেন। অধিকাংশ বাঙ্গালি পরিবারের আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবা›ধবরা একসাথে মিলে দুপুরে আহার করেন তারপর সবাই মিলে একসাথে পহেলা বৈশাখের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। নারী পুরুষ ও শিশুরা বৈশাখী মেলায় কেনাকাটাঁ করতে যায়।

index

ব্যবসায়ী ও তাদের ক্রেতারা বিভিন্ন দোকানে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করে বিকাল ৫টার মধ্যে এসব কর্মকান্ড শেষ করার আদেশটি কে মনে হয় নিরাপওার জন্য সময়ের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হয়েছে বৈশাখের কর্মসূচীকে। স্বল্প সময়ের মধ্যে আবহমান কাল থেকে উৎসবের সব কর্মকান্ডে অংশগ্রহন করা কঠিন ব্যাপার। চিরচারিত নিয়মকে সংকোচিত করে ব্যাক্তি স্বাধীনতা হরন করা হয়েছে মৌলবাদি ও জঙ্গিদের হুমকির কারনে।

পহেলা বৈশাখের আনন্দস্রোতকে সংকোচিত করে সময়ের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হয়েছে। যা মৌলবাদি দুস্কৃতি কারিদের কাছে আত্মসমর্পণ করা যা দীর্ঘদিন যাবৎ মৌলবাদিরা কামনা করে আসছে। বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখকে নিরাপওার জন্য মৌলবাদিদের অপকর্মের হাত থেকে বাঁচতে স্বরাষ্টমন্ত্রী হয়তবা সংক্ষিপ্ত করলেন পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানমালাকে।

আমরা যারা বাঙ্গালী সাংস্কৃতিতে বিশ্বাস করি পরোক্ষভাবে এটা আমাদের পরাজয়।এই পরাজয় যদি স্থায়ীরূপ নেয় তাহলে আগামীতে হয়তবা মৌলবাদিদের হুমকিতে ঘড়ের বাইরে এসে আর পহেলা বৈশাখের আনন্দ উৎসব করা যাবেনা। দেয়াল ঘেরা যায়গায় অথবা ঘড়ের ভিতরে এই অনুষ্ঠানটি করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন সরকারি কর্মচারি কর্মকর্তাদের বৈশাখী ভাতা দিচ্ছেন উৎসবকে সার্বজনিন একটি জাতীয় উৎসবের মর্যাদা দিচ্ছেন সেই সময় আওয়ামীলীগের সহযোগি সংগঠন আওয়ামী ওলেমালীগ পহেলা বৈশাখকে হিন্দুদের অনুষ্ঠান বলে ঘোষনা করছে। তারা আরও বলেছে এটি মুসলমানদের অনুষ্ঠান হতে পারেনা।

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগের সভানেএী শেখ হাসিনার মনমানুসিকতার সাথে এবং আওয়ামীলীগের আদর্শের সাথে ওলামালীগের এই বক্তব্যটি সাংঘর্ষিক। তাই এ ব্যাপারে আওয়মীলীগকে সতর্ক হতে হবে। দলের নামে কেউ যেন এ ধরণের বক্তব্য না দিতে পারে।

images

পহেলা বৈশাখকে বাঙ্গালীরা একটি অসাম্প্রদায়িক উৎসব বলে মনে করে। এই দিনে বাংলা ও বাঙ্গালীর কৃষ্টি লোকঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিকে সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরা হয়। বাঙ্গালীর জাতিয় জীবনে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এই রেওয়াজটি চলে এসেছে। গ্রাম থেকে শহর সর্বএ এই উৎসবটি পালিত হয় সার্বজনীন ভাবে। গ্রামীন ঐতিহ্যকে ধারন করে শহরেও আয়োজন হয় বৈশাখী মেলার।

মাটির তৈযষপএ,মোড়ি মোরকি, পুতুল, বাঁশবেতের গৃহস্থলী সামগ্রী, বাচ্চাদের খেলনা থেকে শুরু করে সব কিছুই পাওয়া যায় বৈশাখী মেলায়। গ্রামীন জনপদের সাধারন মানুষ সারা বৎসর অপেক্ষায় থাকে বৈশাখী মেলা থেকে তাদের গৃহস্থলী ও প্রয়োজনীয় সখের সামগ্রী কেনার জন্য। বাচ্চারা তাদের পছন্দের সামগ্রী কিনে নেয় মেলা থেকে।

তাই বাঙ্গালীর জাতীয় জীবনে গ্রাম থেকে শহর, সমতল থেকে পাহাড়ী সমস্থ জাতী সত্বার সাথে মিশে আছে বৈশাখী মেলা। আর সেই মেলাকে কোন প্রকার বিধি নিষেধ দিয়ে বিচ্ছিন্ন করা যাবেনা বাঙ্গালীর জীবন থেকে। অতীতেও বাঙ্গালী জাতীর সাংস্কৃতি ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক জীবনধারার উপর জঙ্গি, মৌলবাদী ও সন্ত্রাসীরা ভয়ভীতি দেখিয়ে আক্রমন করে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছে কিন্তু পারেনি ভবিষ্যতেও পারবেনা। বাঙ্গালীর ইতিহাস অন্য কথা বলে।

পাকিস্তান আমলে যখন রবীন্দ্র সংগীত ও নজরুল ইসলামকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল বাঙ্গালী জাতি ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা তা মানেনি। ২০০১ সালে রমণার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে মৌলবাদীরা যখন গ্রেনেট চার্জ করে মানুষ হত্যা করে ভয় দেখিয়ে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানকে চিরদিনের জন্য বন্ধ করতে চেয়েছিল বাঙ্গালী জাতি তা হতে দেয়নি।

যথারীতি প্রতি বৎসর সাহসীকতার সহিত তাদের ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখকে বরণ করে নিচ্ছে ছায়ানট। অংশগ্রহন করছে লক্ষাধিক বাঙ্গালী। যশোহরের উদীচির অনুষ্ঠনে বোমাহামলা চালিয়ে পন্ড করে দিয়েছিল অনুষ্ঠান। নিহত হয়েছিল অনেক জন।

কিন্তু বাঙ্গালীরা শোক থেকে শক্তি সঞ্চয় করে এখনো চালিয়ে যাচ্ছে অনুষ্ঠান। কোন ভয় ভীতি তাদেরকে রুখতে পারছেনা। যতদিন বাঙ্গালীজাতি থাকবে তাদের জাতীয় জীবনে ততদিন তাদের এই প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ টিকে থাকবে। কোন ভয়ভীতি শৃঙ্খল একে বাধাঁগ্রস্থ করতে পারবেনা।

আমরা বিশ্বাস করি কোন সরকার যদি বাঙ্গালী জাতির এ প্রাণের উৎসবকে নিরাপওা দিতে ব্যার্থ হয় তবে সমগ্র বাঙ্গালী জাতি অতীতের অন্যান্য ঘটনার মত নিরাপওা দিবে। এ প্রজন্মের বন্ধুরা তাদের পূর্ব পুরূষদের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিকে ধারন করে যাবে যুগ থেকে যুগান্তরে। নসাৎ হতে দেবেনা কোন দিন।

বুকের রক্ত দিয়ে পূর্ব পুরুষদের মত রক্ষা করবে বাঙ্গালী জাতির কৃষ্টি ও সাংস্কৃতিকে। তাই এবারের নববর্ষে বাঙ্গালী জাতির প্রত্যাশা এ দেশ থেকে জঙ্গি ও মৌলবাদীদের চিরদিনের জন্য নির্মুল করে আগামী দিনগুলিতে ভয় ভীতি ম্ক্তু পরিবেশে উৎযাপন করবে পহেলা বৈশাখ।

ব্রেকিং নিউজঃ