| |

মৃত্যপুরী চকবাজার!

আপডেটঃ 6:32 pm | February 21, 2019

Ad

মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও পুরান ঢাকার চকবাজারের ওয়াহিদ ম্যানশন ও সংলগ্ন এলাকার ছিল মানুষে ভরপুর। হৈচৈ, অসংখ্য মানুষের আনাগোনা, মালামাল ওঠানো-নামানো, গাড়ি-রিকশার জটলা। সেই এলাকায় এখনও সবই আছে। তবে শুধু কঙ্কালসার চেহারা সবকিছুর। মাত্র কয়েকঘণ্টা ব্যবধানে জনাকীর্ণ ওই এলাকা যেন পরিণত হয়েছে মৃত্যুপুরীতে। সেই ওয়াহিদ ম্যানশন জুড়ে ক্ষতচিহ্ন। কোনো তলার দেয়াল ভাঙা, বেরিয়ে আছে শুধু কংক্রিটের পিলার। কোনো তলায় খসে পড়েছে সব প্লাস্টার, গ্রিল বাঁকাচোরা, ভিতরে যে কিছু ছিল সেটা বোঝার উপায় নেই। কোনো ঘরে চিহ্ন আছে শুধু মাথার খুলির।

চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্লাস্টিকের নানা ধরনের বোতল, পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া যানবাহনের লোহালক্কড়, ভেঙে পড়া দেয়াল আর বিভিন্ন ধরনের আবর্জনার স্তূপ। আর এই আবর্জনার মধ্যেই লাশ। বাতাসে বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল, লোহা, ইটপাথর আর লাশ পোড়ার গন্ধ। অগ্নিশিখার দাউ দাউ শব্দ ছাপিয়ে স্বজন ও সহায়-সম্বলহীন হারা মানুষের আহাজারির আওয়াজ। সব মিলিয়ে এরকম ভীতিকর পরিবেশ এখন পুরান ঢাকার চকবাজারে ওয়াটার্স রোডে চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের আশপাশের এলাকায়।

বুধবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ১০টার দিকে চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের সামনে আগুনের সূত্রপাত্র। স্থানীয়রা বলছেন, রাস্তায় তখন ট্রাফিক জ্যাম। সারি সারি যানবাহনের মাঝখানে দাঁড়ানো একটি পিকআপ ভ্যানের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয় হঠাৎ। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে দাঁড়ানো কয়েকটি রিকশা, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারে।

আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের কয়েকটি বহুতল ভবনেও। এরমধ্যে একটি ভবনে কেমিক্যাল গোডাউন এবং প্লাস্টিক তৈরির উপকরণ থাকায় আগুন আরও বেশি শক্তিতে ছড়ায়। প্রথমে যে ভবনটিতে আগুন লাগে সেটি সাততলা। ওয়াহেদ ম্যানশন নামের এই ভবনটির নিচতলায় কেমিক্যাল গোডাউন এবং প্লাস্টিক তৈরির উপকরণের দোকান ছিল।

ফায়ার সার্ভিস খবর পেয়ে ছুটে এলেও সরু গলির কারণে কাজ করতে ঝামেলা পোহাতে হয়। ৩৭টি ইউনিট সাড়ে চারঘণ্টার মতো কাজ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাতের ১৫ ঘণ্টা পর আগুন নিভিয়ে উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন উদ্ধার অভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করেন। এদিকে সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ও ঢামেক হাসপাতালের মর্গে জমা হয়েছে ৮১টি মরদেহ।

অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণার সময় মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, রাসায়নিকের গুদামগুলো সরাতে তারা এখন জোর পদক্ষেপ নেবেন। তার আগে সকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এই ঘটনায় ‘শিক্ষা’ হয়েছে, এখন ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগে দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, এখন পর্যন্ত কলেজ ও হাসপাতালের দুই মর্গে মোট ৮১টি মরদেহ রাখা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে আমাদের ৬৭টি ব্যাগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অনেক ব্যাগেই রয়েছে একাধিক মরদেহ। সব মিলিয়ে এসব ব্যাগ থেকে পাওয়া ৭০টি মরদেহ রাখা হয়েছে ঢামেক মর্গে। এর বাইরে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রাখা হয়েছে ১১টি মরদেহ।

ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, যে ৮১টি মরদেহ আমরা পেয়েছি, এর মধ্যে ৩৫টি মরদেহ বর্তমান অবস্থাতেই শনাক্ত করা যাবে। বাকি মরদেহগুলো এতটাই পুড়ে গেছে যে সেগুলো সরাসরি শনাক্ত করার অবস্থায় নেই। সেগুলোকে ফিংগারপ্রিন্ট বা ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মাধ্যমে শনাক্ত করা যাবে।

এদিকে মরদেহের সংখ্যা বাড়তে থাকায় ঢামেকে সেগুলোর স্থান সংকুলান সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের মর্গে ১২টি, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের মর্গে ১০টি ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালেও ছয়টি মরদেহ পাঠানো যাবে। এর বাইরে অন্যান্য হাসপাতালগুলোতেও যতগুলো সম্ভব মরদেহ পাঠিয়ে দেওয়া হবে। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেগুলো শনাক্তের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই অগ্নিকাণ্ডে আহত হয়েছেন বহু মানুষ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন অন্তত ৪০ জন। এর মধ্যে বার্ন ইউনিটে আছেন নয়জন, তার মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। আগুনে চকবাজার চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের পাশের অন্তত পাঁচটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ভবনে বিভিন্ন দোকানের পাশাপাশি ছিল রাসায়নিক, প্লাস্টিক ও প্রসাধন সামগ্রীর গুদাম।

বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে চুড়িহাট্টার ওয়াহিদ চেয়ারম্যানের চারতলা ভবনটিতে প্রথমে আগুন লাগে, এরপর তা ছড়িয়ে পড়ে পাশের একটি, পেছনের একটি এবং সরু গলির বিপরীত পাশের দুটি ভবনে। আগুন লাগার পরপরই চার তলা ভবনটির সামনে থাকা বিদ্যুতের ট্রান্সফর্মার বিস্ফোরণ ঘটে। ওই সময় রাস্তায় থাকা কয়েকটি গাড়িতেও আগুন ধরে যায়। আগুনের সময় রাজমনি হোটেলের সামনের রাস্তায় কয়েকটি গ্যাস সিলিন্ডার ছিল। ট্রান্সফর্মার বিস্ফোরণের পর ওই গ্যাস সিলিন্ডারেও আগুন লেগে ভবনে ও রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। এর পর অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর ১০টি ইউনিট সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করে। পরে ইউনিটের সংখ্যা ৩৭টিতে গিয়ে দাড়ায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে কর্মীর সংখ্যা ছিলো ২০০ জন।

এর বাইরে পুলিশ, র‌্যাবের পাশাপাশি হেলিকপ্টার নিয়ে বিমানবাহিনীও যোগ দেয় আগুন নেভানোর কাজে। দুপুর পৌনে ১টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিভেছে বলে ঘোষণা আসে ফায়ার সার্ভিসের। তার আধা ঘণ্টা পর উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন মেয়র খোকন।

ব্রেকিং নিউজঃ