| |

হেফাজতনামা

আপডেটঃ 10:18 am | April 03, 2021

Ad

তুহিন তালুকদার ॥ অনেক দিন যাবৎ হেফাজতনামা লিখবো বলে ভাবছিলাম। সময় পাচ্ছিলাম না। ২০১৩ সালে উত্থানের পর এ সংগঠনটি দাপটের সাথে ০৭ বছর অতিক্রম করলো। এ উত্থানপর্বের সময়টুকো তারা সফলভাবে অতিক্রম করছে। হেফাজতের আমীর আল্লামা আহমদ ছফী সাহেব একজন নিভৃতচারী শিক্ষক ছিলেন। গোটা জীবন তিনি শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। হাটহাজারি মাদ্রাসাকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস মৃত্যুর পুর্বে এই মাদ্রাসাই তাঁর সাথে চরম অন্যায় আচরণ করেছিলো! সম্ভোবত তাঁর মৃত্যুর কারণও এটিই। এ সংগঠনের দ্বিতীয় লেভেলের নেতারা সংগঠনটিকে ছফী সাহেবের পরিচ্ছন্ন ইমেজকে কৌশকে কাজে লাগিয়েছেন। আমার বিশ্বাস হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠাই ছফী সাহেবের জীবনের সবথেকে বড় ভুল ছিল। শিক্ষা আহরণ ও বিতরণের বাইরে রাজনীতির মধ্যে প্রবেশ করে নিজেকে বিতর্কিত করেছেন। ছফী সাহেবের মৃত্যুর মধ্যে দিয়েই হেফাজত তার মূল নেতাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। যারাই মূলত ইসলাম রক্ষার নাম করে রাষ্ট্রের বড় অংশীদার হওয়ার স্বপ্ন বিভোর হয়ে হেফাজত প্রতিষ্ঠা করেছিলো।হেফাজত এখন যে অবস্থায় আছে তাদের পক্ষে রাষ্ট্র ক্ষমতার চিন্তা করা কঠিন। ধরা যাক, ক্ষমতাসীন সরকারকে তারা হটিয়ে দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় চলে আসলো। আসার পর ক্ষমতার মসনদে তাদেরকে বসতে হবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি অর্গানকে তাদের চালাতে হবে। সেই পরিচালনার জন্যে মেধার দরকার। দরকার হলো প্রতিটি সেক্টরে নিজস্ব লোকবলের। বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, তথ্য প্রযুক্তিবিদ, চিকিৎসক লাগবে। অর্থাৎ প্রতিটি শাখা উপ-শাখাতে নিজস্ব লোক ছাড়া রাষ্ট্র চালানো যায় না। এটি তারা নিজেরাও জানে। এতো মেধাবী লোকবল তাদের নাই।ক্ষমতা দখলের পর শুধুমাত্র অজ্ঞতার জন্যে সেই ক্ষমতা তাদের ছেড়ে দিতে হবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত কিংবা অন্যদের হাতে! জামাতের হাতে ক্ষমতা দেয়া তাদের জন্যে বোকামী। জামাত একটি বিপ্লবী সংগঠন। প্রতিটি সেক্টরেই জামাত ইতোমধ্যে নিজস্ব লোকবল তৈরি করে ফেলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল, অর্থনীতির খাত, কোথায় জামাতের লোক নাই? অবশ্য কওমী মাদ্রাসাতে জামাতের বিচরণ খুব একটা দেখা যায় না। জামাত এদেরকে নিয়ে কখনো ভাবসে বলে মনেহয় না। জামাত মনেই করে এঁরা বহু বিভক্ত, অনুৎপাদনশীল ও পশ্চাৎপট খাতের লোক। তাদের কাঙ্খিত সমাজ পরিবর্তনে এঁরা খুব বড় ভূমিকা রাখতে পারবে না। রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারলে কওমী শিবিরকে আপনা-আপনিই বোগলদাবা করা যাবে। জামাতের এই সমীকরণ হেফাজতপন্থীরাও বুঝে। এক বনে দুই বাঘ থাকে কীভাবে!হেফাজত স্পষ্টতই রাষ্ট্রব্যবস্থার উপর একটা বড়সড় প্রেসার তৈরি করছে এবং করে যাবে। রাষ্ট্রকে যেনো ভাবতে হয় যে, হেফাজতে ইসলাম রাষ্ট্রের একটি বড় অংশীদার। তারা প্রত্যাশা করে; রাষ্ট্র কোন সিদ্ধান্ত নিলে অবশ্যই তাদের সাথে পরামর্শ করে নিবে। পরামর্শ সাপেক্ষে হেফাজত নেতৃত্ব অনেক কিছুকে বৈধতা দিবে বলেই আমার বিশ্বাস (এখন যেগুলো দিচ্ছে না)। সেটা ধর্ম সমর্থন করুক কিংবা না করুক। তারা ফতোয়া দিয়ে একটা বৈধতা দিতে পারবে। আমার এ বিশ্বাসের পিছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। যেমন মাদ্রাসাগুলোতে নিয়ম করে বলৎকারের ঘটনা ঘটছে, এগুলো নিয়ে হেফাজতের কোন মাথা ব্যাথা নাই। বিদেশী বা দেশীয় অসৎ উপার্জনের অর্থ মাদ্রাসাগুলোতে প্রবেশ করছে এটি নিয়েও তারা চিন্তিত নয়। ভিক্ষাবৃত্তি করে ওয়াজ মাহফিল করা, সেই মাহফিলে বক্তাদের হেলিকপ্টারে চড়ে মোটা টাকার বিনিময়ে ওয়াজের বিধান ধর্মে নাই। এটি তারা নিয়মিত করে যাচ্ছেন। মাদ্রাসার নাবালক বাচ্চাদেরকে দিলে আন্দোলের নামে বন্দুকের নলের সামনে ঠেলে দিচ্ছে, এটিও ধর্মে নাই।রাষ্ট্রের কাছে হেফাজতের প্রত্যাশার এই অবস্থান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও বুঝে গেছে, ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলোও বুঝে গেছে। গোটা দেশে হেফাজতের লাখ দশেক লোক আছে যাদেরকে ডাক দিলে মাঠে পাওয়া যায়। এই দশ লাখ লোকের শক্তিকে তাই সব পক্ষই সমীহ করে। হেফাজত কোন অন্যায় করলেও ক্ষমতাসীনরা সেই দায় চাপায় বিএনপি-জামাতের ঘাড়ে। কারণটা খুবই সহজ! হেফাজত তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। রাজনীতি প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথেই রাজনীতি করতে হয়। বিএনপিও ইস্যুভিত্তিক হেফাজতের সাথে গলাগলি করে। সেই গলাগলি খুব বেশী সময় থাকেও না! ক্ষমতাসীনরা মুলা ঝুলায়া হেফাজতের নেতাদেরকে তাদের পক্ষে নিয়ে যায়।মোটা দাগে দেশে একটি নতুন খেলার নাম হলো, “হেফাজত-হেফাজত খেলা”। হেফাজত ধর্মের নাম ধরে সুড়সুড়ি দেয়। ‘দলের চেয়ে ধর্ম বড়’ শ্লোগান দিয়া সব দল থেকেই কিছু লোক হেফাজতের পক্ষে দাঁড়িয়ে যায়। এটার একটা বড় লভ্যাংশ তারা ঘরে উঠাতে পেরেছে! হেফাজত যাই করুক কিংবা বলুক এটা রাষ্ট্রের মাথার উপর দিয়ে যায়। মামলা-হামলার কোন বিষয় থাকে না। সাধারণ মানুষ যদি মুক্তিযুদ্ধ বানানটেও সামান্য ভুল করে তাহলে তাঁর রক্ষা নাই। চেতনায় আঘাত লেগে যায় কিছু মানুষের। আর হেফাজত! মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধুকে ধুয়ে দিলেও তাদের কিছু হবে না এটি তারা-আমরা সবাই প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছি ইতোমধ্যে।আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতা বিবেচনায় ওদেরকে কিছু বলছে না। বিরোধী দলগুলো? তারা কখনো বলেছে হেফাজত আর সরকার আঁতাত আছে? কিংবা হেফাজত এই এই অন্যায় কাজগুলো করছে? বলবে না। দলগুলো একে অন্যকে বলবে কিন্তু হেফাজতে বলবে না। হেফাজত যে শক্তিটুকু অর্জন করেছে এর প্রতি সবারই দূর্বলতা আছে। সবাই যার যার সুবিধে মতো হেফাজতকে ব্যবহারের চিন্তায় আছে। এই সহজ সরল থিউরিটা হেফাজত জানে বিধায় এঁরা দরকষাকষি করে কখনো আওয়ামী লীগের সাথে থাকে। স্বার্থে টান দেখা দিলে বিএনপির ঘরে চলে যায়। হিসাব খুব সহজ!আপনারা যারা বিশ্বাস করেন এই দেশ একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন হয়েছিলো। সেই স্বাধীনতার রক্তঋণ হলো, “অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ”। এমন ভাবাপন্ন লোকগুলো খবরের কাগজে, ফেইসবুকে, মধ্যরাতে টেলিভিশনে ঝড় তুলতে পারেন কিন্তু রাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব রাখার বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ থেকেই গেলো। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার বিচার দেখতে পারা, জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের স্পর্ধা যারা দেখায় তাদের বিচারের সম্ভাবণা কম বলেই আমার মনেহয়। বস্থুত বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ হাইজ্যাক হয়ে গেছে এমনটি ভাবতে চাইলে ভাবতে পারেন বৈকি!

ব্রেকিং নিউজঃ