| |

শত বৎসর পূর্ব থেকে হাল পর্যন্ত ফতোয়া ও মৌলভীদের রাজনীতি

আপডেটঃ 12:26 pm | April 23, 2021

Ad

আব্দুল কদ্দুস মাখন ॥ -বৃটিশ শাসনামলের পূর্বে মোঘল যুগে এই মুলুকের সরকারী ভাষা ছিলো ফার্সী। মুসলমানরা এই ভাষাটি জানতো বলে কিছু সরকারী চাকুরী বাকুরী করতে পারতো। ইতিহাসে সেই সময়ের মুসলিম গন স্থান করে নিয়েছে।১৭৫৭ সালে ইংরেজরা ক্ষমতা দখলের পর ইংরেজিকে সরকারী ভাষা ঘোষণা দিয়ে তার প্রচলন শুরু করে। তখন ভারতবর্ষের মৌলভীরা ফতোয়া জারী করলো, ইংরেজি শিখলে, জানলে ও বললে ঈমান থাকবে না। মুসলমানদের বিশাল অংশ ইংরেজিতে আগ্রহ দেখালো না, ইংরেজি শিখলো না, ফলে সরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ কাজে তারা সুযোগ হারাল। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের তুলনায় বহু পিছিয়ে গেল। মুসলিমদের মাঝে চালু হলো ধর্মীয় (মাদ্রাসা) শিক্ষাব্যবস্থা। এখানে কোরআন, হাদিস ছাড়া অন্য কিছু পড়ানো হতো না। ফলে মুসলিম গন পূ্র্ণাঙ্গ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হলো, প্রকৃত জ্ঞান অর্জন থেকে দূরে থাকলো।বিখ্যাত শিক্ষাবিদ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী ব্যাক্তি সৈয়দ আহমদ যখন ইংরেজি পড়ার জন্য আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করলেন, তখন তাকে পীর মৌলভীরা ‘কাফের’ বলে ফতোয়া দিয়েছিলো।বৃটিশরা ভারতবর্ষে রেল ব্যবস্থা চালু করলে মোল্লা, মৌলভী ও পীর মুর্শীদরা ফতোয়া দিল, ট্রেনে চড়লে ঈমান থাকবে না।বিভিন্ন প্রয়োজনে কেউ ছবি উঠালে মোল্লা, মৌলভী ও পীর গন তাকে কাফের আখ্যা দিয়ে তার জানাজা পড়তো না! রেডিও, টেলিভিশনকেও মোল্লা, মৌলভী ও পীর গন হারাম ঘোষণা করেছিলো। বিমান আবিস্কারের পর মোল্লারা ওয়াজ মাহফিলে বয়ানকালে একটুকরো কাগজ ছিঁড়ে তা শূন্যে ছেড়ে দিতেন। কাগজটি নিচে পড়ে গেলে তা দেখিয়ে বলতেন, একটি কাগজের টুকরা যেখানে ভেসে থাকতে পারে না সেখানে লোহার তৈরি জাহাজ কীভাবে আকাশে উড়বে। জিন্নাহ গং যখন পাকিস্তান আন্দোলন শুরু করলেন, তখন মৌলভী ও পীর সাহেবরা পাকিস্তান আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে জঘন্য ভাষায় আক্রমণ করেছিল। কংগ্রেসের টাকায় হাজার হাজার লিফলেট পোষ্টার বিলি করেছিল। ইসলামের নামে তারা কোরআন ও হাদিস দিয়া প্রমাণ করার চেষ্টা করতো যে- পাকিস্তান দাবি করা আর কোরানের খেলাফ করা একই কথা। অবশ্য আরেকদল পীর মাওলানা কেতাব কোরআন দিয়া প্রমাণের চেষ্টা করতো যে- পাকিস্তান চাওয়া জায়েজ আছে।’ ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় সিলেট অঞ্চল পাকিস্তানের সঙ্গে নাকি ভারতের সঙ্গে থাকবে সেই বিষয়ে গণ ভোটের আগে পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারণা চালাতে গিয়ে মওলানাদের ফতোয়ার মুখোমুখি হওয়া প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু তার লেখা বইয়ে লিখেছেন, ‘সিলেটের ১৫ হাজার মওলানা ফতোয়া দিলেন যে সিলেট জেলার পাকিস্তানে যাওয়া উচিত হবে না। তারা কোরআন হাদিস দিয়ে এটি প্রমাণ দিতেও চেষ্টা করলেন। কিন্তু আমরা বললাম, ভোট হবে। মানুষের ভোট পাকিস্তানের পক্ষে পড়লে সিলেট পাকিস্তানে যাবে, ভারতের পক্ষে পড়লে ভারতে যাবে। এরপর হাজার হাজার মওলানা কংগ্রেসের টাকা নিয়ে বক্তৃতা শুরু করলেন- পাকিস্তানে ভোট দেওয়া হারাম। ….. সোহরাওয়ার্দী সাহেব আমাকে মাইক্রোফোন দিয়েছিলেন। আমি মাইক্রোফোনে বক্তৃতা শুরু করলাম। পীর সাহেবরা প্রথমে দাঁড়াইয়া ফতোয়া দিলেন- মাইক্রোফোনে কথা বলা হারাম।’ (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রচিত, আমার দেখা নয়চীন থেকে নেয়া।)১৯৫৪ সালে নির্বাচনের সময় পীর মৌলভীরা ফতোয়া দিয়েছিলো যুক্তফ্রন্টকে ভোট দিলে বিবি তালাক হয়ে যাবে। ১৯৬৯ সালে চাঁদে মানুষ গেলে ফতোয়া জারী হলো, চাঁদে মানুষ গেছে বিশ্বাস করলে ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে।১৯৭১ সনে এই সব পীর নৌলভীরা ফতোয়া জারী করলো, পাকিস্তানের বিরোধিতা করা কোরান হাদীস বিরুদ্ধ। তারা পাকিস্তানিদের সাথে হাত মেলালো।মহামারি কভিড-১৯ নিয়েও ফতোয়া, গোঁয়ার্তুমি ও মুর্খতা চলমান। ধর্ম সভায় ওয়াজ সহ বিভিন্নভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি অনুন্নত অংশকে গোমরাহ করে রেখেছে, এরা বাস্তবতা বোঝে না। ধর্মের প্রতি অন্ধ বিশ্বাসের কারণে অনেকেই সাবধান না হওয়ায় রোগটা ছড়িয়ে পড়ছে, বহু মৌলভী সহ এখন অনেকেই আক্রান্ত হয়ে প্রান খোয়াচ্ছে। বিশ্বের নামীদামী মুসলিম দেশে গৃহীত পদক্ষেপের সমালোচনা করছে কিন্তু শিক্ষা নিচ্ছে না। এই সব মোল্লারা পরবর্তীতে ইংরেজি শিখছে, ট্রেনে ভ্রমন করছে, ছবি তুলছে, অনেকের সন্তান আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শিখেছে, মোল্লারাও বিভিন্নভাবে ইংরেজিতে দীক্ষা নিয়েছে, এখন মাইক্রোফোনে ইংরেজিতে বক্তৃতা করে, রেডিও, টেলিভিশন ক্রয় করে উপভোগ করছে, টকশোতে অংশ নিচ্ছে, বিমানে উঠে হজ্বে যাচ্ছে, পাকিস্তান মেনে ভারত ছেড়েছে, বাংলাদেশ মেনে নিয়েছে (বাধ্য হয়ে), কিন্তু ফতোয়া জারী অব্যাহত রেখেছে।ফতোয়া মুসলিম সমাজকে পিছিয়ে দিয়েছে। অথচ ইসলাম শান্তি ও সমৃদ্ধির ধর্ম।মুসলিম সমাজের নিকটে আহবান এদের অকারণ ও অযৌক্তিক ফতোয়া প্রত্যাখ্যান করুন, অগ্রসরমান বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যান,নিজ গোত্রকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করুন, সুখে শান্তিতে বসবাস করুন।

ব্রেকিং নিউজঃ