| |

প্রয়ান দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা শ্রদ্বেয় কামাল লোহানী ভাইকে দৈনিক প্রভাতের সেই দিনগুলো আজ শুধুই স্মৃতি

আপডেটঃ 11:13 pm | June 20, 2021

Ad


মো: নাজমুল হুদা মানিক ॥ প্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই বাংলাদেশের এককালের প্রথিতযশা সাংবাদিক শ্রদ্বেয় কামাল লোহানী ভাইকে। কিছুদিনের জন্য উনার সান্নিদ্ধে কাজ করার সুযোগ হয়ে ছিল আমার। তিনি তখন দৈনিক প্রভাত পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসাবে নিষ্ঠা ও সততার সাথে দ্বায়িত্ব পালন করতেন। আমি তখন আওয়ামীলীগের বর্ষিয়ান নেতা জনাব মোজাফ্ফর হোসেন পল্টু সাহেবের দৈনিক প্রভাত পত্রিকায় ময়মনসিংহ প্রতিনিধি ও পরে ব্যুরোচীফ হিসাবে কাজ করতাম। ২৯ চামেলীবাগ শান্তি নগরের ৩য় তলায় ছিল পত্রিকা অফিস। তৎকালীন সময়ে বেশ জমজমাট ছিল পত্রিকার সকল বিভাগ। ৩য়তলায় নিউজ সেকশনের মাঝামাঝি বড় একটি ধনুক আকৃতির টেবিলের মাঝখানে বসতেন খ্যাতিমান একাত্তরের শব্দসৈনিক কামাল লোহানী ভাই। বর্তমান সময়ের আধুনিক সব প্রযুক্তি তখনও সহজলভ্য ছিলনা। প্রিন্ট করা ছবি আর হাতের লেখা খামে করে পাঠাতাম। সড়ক দুর্ঘটনা বা হত্যাকান্ডের নিউজ টেলিফোনে পাঠালেও অধিকাংশ নিউজ পাঠাতে হতো হাতে লিখে। টেলিফোনের নিউজ রিসিপ করতেন নির্বাহী সম্পাদক তারিকুল ইসলাম ভাই। এমনি ভাবে ধান কাটার মওসুমের প্রথমদিকে হাতে লিখে একটি নিউজ ও ছবি পাঠালাম। আমান ধান কাটার সেই নিউজ ছবি সহ লীড নিউজ হিসাবে পত্রিকায় প্রকাশিত হলো। আমার নামে লিখা লীড নিউজের পত্রিকা হাতে পেলাম। এটি ছিল আমার জন্য বিশাল আনন্দের বিষয়। তখন শ্রদ্ধেয় কামাল লোহানী ভাই এর পাশেই বসতেন নির্বাহী সম্পাদক তারিকুল ইসলাম ভাই। অন্য একটি কক্ষে বসতেন উপসম্পাদক জনাব শামসুল আরেফীন খান সাহেব। সহকারী সম্পাদক ছিলেন জনাব ফাইজুস সালেহীন ভাই। চীফ রিপোর্টার ছিলেন নুরুদ্দীন ভুইয়া ভাই। বিভাগীয় সম্পাদক ছিলেন আমিরুল ইসলাম ভাই। ক্রাইম রিপোর্টার ছিলেন প্যাট্রিক ডি কুস্তা দাদা। রাজনৈতিক ভিট করতেন সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার মোশাররফ হোসেন বাবলু ভাই। চীফ ফটো সাংবাদিক ছিলেন শরীফ সরোয়ার, স্পোটস রিপোর্টার ছিলেন মনোয়ার হোসেন, সার্কোলেশন ম্যানেজার ছিলেন আব্দুল খালেক ভাই। রিসিপসনে বসতেন তাহমিনা আপা। দৈনিক প্রভাতের ভরাযৌবনে অনেকের সাথে তখন পরিচয় ছিল। কালের বিবর্তে আজ অনেকের নাম মনে নেই। সেই সময় পত্রিকা অফিসে গেলে রিসিপসনে অপেক্ষমান তাহমিনা আপা মিষ্টি হেসে বলতেন কোথা থেকে এসেছেন, কার কাছে যাবেন, বসেন স্যারের সাথে কথা বলে অনুমতি নেই। রিসিপসনের সামনে সোফায় বসে থাকার পর অনুমতি মিললে দেখা হতো কাঙ্খিত ব্যাক্তি সাথে। মজার ব্যাপার ছিল আমন ধানের নিউজটি ছাপার পর থেকেই শ্রদ্ধেয় কামাল লোহানী ভাই আমার নামটি তাহমিনা আপার কাছে দিয়ে রেখে ছিলেন, আমি অফিসে গেলেই যেন উনার সাথে দেখা করি। মহান আল্লাহতালার অশেষ রহমতে ২/১ দিন পরই আমি পত্রিকা অফিসে যাই। রিসিপসনে যাওয়ার পর সাংবাদিক নাজমুল হুদা মানিক, ময়মনসিংহ থেকে এসেছি বলতেই আপা বললেন, আপনার অনুমতি চাওয়ার দরকার নেই। স্যার আগেই আপনাকে দেখা করার জন্য অনুমতি দিয়ে রেখেছেন। স্যার বলেছেন, আপনি আসলেই যেন আপনাকে স্যারের কাছে পাঠিয়ে দেই। আমি সাংবাদিকতায় আসার পর থেকেই জেনেছি জনাব কামাল লোহানী একজন বিশাল বড় মাপের মানুষ। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন শব্ধ সৈনিক। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। ছিলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক। উদিচীর কেন্দ্রীয় সভাপতি সহ স্বাধীকার আন্দোলনের আজীবন সৈনিক। বাংলা একাডেমীর গুরুত্বপুর্ন পদেও ছিলেন এই প্রথিতযশা আপাদমস্তক বাঙ্গালী সাংবাদিক। পত্রিকা অফিসে প্রবেশ করতেই প্রথমেই চোখে পড়লো ডিলেডালা সাদা পাঞ্জাবী পাজামা আর চোখে চশমা পড়া একজন সাদা মনের মানুষ। পাশে বসা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক তারিক ভাই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। লোহানী ভাই এ হচ্ছে সাংবাদিক মানিক। বাড়ী ময়মনসিংহ। আমি তখন দাড়িয়েই ছিলাম। লোহানী ভাই বললেন, বসেন। আপনার রিপোর্টটি পড়েছেন। তিনি পত্রিকা অফিসের একজনকে ডেকে বললেন, ঐ দিনের পত্রিকা নিয়ে আসো। আমাকে সামনে বসিয়ে পত্রিকা পড়ালেন। আসলে আমার রিপোর্ট লীড নিউজ হয়েছে, এটিই ছিলো আমার আনন্দ। কিন্তু এই লিখাটিতে বাংলাদেশের এত বড়ো মাপের একজন মানুষের হাত পড়েছে, এটি আমসার অনুভুতিতে ছিলনা। আসলে খুশির কারনে লেখাটি ভালভাবে আমি পড়ে দেখিনি। তিনি আমাকে কেন রিপোর্টটি পড়তে বললেন এতক্ষনে আমার বোদদ্বয় হয়েছে। আমি বুঝলাম উনার হাত পড়াতে লেখাটি সমৃদ্ধ হয়েছে। তাছাড়া বানানের ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুব সজাগ ও সচেতন। তারপর থেকে যতবার পত্রিকা অফিসে গিয়েছি, লোহানী ভাই সাথে দেখা করার চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথা বলতেন। জানতে চাইতেন কুমুদিনী হাজং, মনোরঞ্জন ধর সহ বিভিন্ন ব্যাক্তির কথা। একবার তিনি বললেন ময়মনসিংহে আসবেন। তৎকালীন জেলা প্রশাসক জনাব রফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জনাব শফিকুল ইসলাম স্যারকে বলে সার্কিট হাউজে থাকার ব্যাবস্থা হলো। বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি ড. মোহাম্মদ আলী মহোদয়, জেলা প্রশাসক জনাব রফিকুল ইসলাম মহোদয়, ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবে সাংবাদিকবৃন্দ, ময়মনসিংহ পৌরসভার চেয়ারম্যান এডভোকেট মাহমুদ আল নুর তারেক ভাই সহ বিভিন্ন ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যাক্তিদের সাথে মতবিনিময় করলেন। বাবু মনোরঞ্জন ধর মহোদয়ের বাসায় গিয়ে উনার সাথেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেন। কাজের ফাঁকে বেড়ালেন কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের পার্কে, ব্রম্মপুত্র নদের পাড়ে, শশিলজ, আলেকজান্ডার ক্যাসেল, মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ী সহ বিভিন্ন স্থানে। মুক্তাগাছার মন্ডা খেয়ে খুব প্রশংসা করলেন। ময়মনসিংহ হতে বিদায়ের পথে জানতে চাইলেন গুর্নয়মান মঞ্চের কথা। নাটকের মানুষ ছিলেন তিনি। মঞ্চটি দেখতে না পেড়ে কিছুটা অতৃপ্ত ছিলেন তিনি। সারাদিনের ব্যাস্ততা আর সময়ের গতি উনাকে রাজধানী ঢাকার দিকে নিয়ে গেল। মাইক্রোবাস চলছে ঢাকার পথে। আমাকে পাশে বসিয়ে গল্প করছিলেন প্রথিতযশা সাংবাদিক লোহানী ভাই। এমন সময় তারিক ভাই বললেন মানিক আমরা কিন্তু ভালুকা পাড় হচ্ছি। এমন সময় লোহানী ভাই বললেন গাড়ী থামাও, গল্প করতে করতে এতোদুর চলে এসেছি। মানিকের ময়মনসিংহে যেতে অনেক কষ্ট হবে। তিনি বললেন, তারিক সাহেব মানিকের যাবার ব্যবস্থা করেন। তারিক ভাই আমাকে গাড়ী ভাড়া দিয়ে বললেন, এটি লোহানী ভাই দিয়েছে, আমার কিছু করার নেই। আপনাকে এটা নিতেই হবে। আসার সময় মনে মনে ভাবলাম, অন্য পত্রিকার বড় কর্তাগন আসলে মফস্বল এলাকার ভাইয়েরা তাদের জন্য কত কিছু করেন। এতোবড় মাপের একজন মানুষ আমার শহরে আসলেন, আমি উনার জন্য ও পত্রিকার বড়কর্তাদের জন্য কিছুই করতে পারলাম না। বরং উনাদের গাড়ীতে করে আমাকে সব জায়গায় নিয়ে গেলেন, উনারা যা খেয়েছেন আমাকেও তা খায়িছেন। অবশ্য ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের তৎকালীন কর্মকর্তাগন অতিথিগনকে আপ্যায়ন করে ছিলেন। এটি ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের কর্মকর্তাদের প্রসংসনীয় সৌজন্যতা ও ভদ্রতাও বটে। প্রয়াত সাংবাদিক নেতা সুলতান উদ্দিন খান সুলতান ভাই লোহানী ভাই এর সাথে সাক্ষাৎ করে আমাকে পত্রিকার পক্ষ থেকে নিয়োগপত্র ও বেতন দেয়ার আহবান জানিয়ে ছিলেন। শ্রদ্ধেয় লোহানী ভাই বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব সহকারে নিয়ে ছিলেন, কিন্তু বিধিবাম পত্রিকা অফিসের কর্নধারদের পদ্ধতিগত কারনে সাংবাদিকদের অনেক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় গতি হারায়। অবশেষে বেশ কিছুদিন পর পত্রিকা অফিসে যাওয়ার পর তিনি আক্ষেপ করে জানালেন অনেক ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও সব কিছু করা সম্বব হয়ে উঠেনা। তারপর অনেক কথা, অনেক স্মৃতি, অনেক কষ্ট, অনেক বেদনা, অনেক হতাশা, অনেক দু:খ, ইত্যাদি, ইত্যাদি। অবশেষে হটাৎ একদিন তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আর কোন দেখা হবেনা লোহানী ভাই এর সাথে। হবেনা সালাম বিনিময়। সময় গড়িয়েছে অনেক। মহান আল্লাহতালার ইচ্চায় তাঁরই হুকুমে হয়তো যেকোন আমাদেরকেও চলে যেতে হবে এই পৃথিবী ছেড়ে। আমরাও হারিয়ে যাব আমাদের সহকর্মীদের কাছ থেকে। হয়তো কেউ মনে রাখবে, হয়তোবা কেউ মনে রাখবেনা। কর্মব্যস্ততার এই কঠিন নিয়মের মাঝে যথোপোযুক্ত ভাবে হয়তো সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানো সম্বব হয়ে উঠেনি। তারপরও প্রথিতযশা দিগপাল শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক কামাল লোহানী ভাইকে প্রানের গহীনকোন থেকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা। মহান আল্লাহতালাহ আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করুন। মহান আল্লাহতালার কাছে এই দোয়া করি সাংবাদিক আন্দোলনের বাতিঘর কামাল লোহানী ভাইকে সুউচ্চ মাকাম দান করেন। আমিন।

ব্রেকিং নিউজঃ