| |

দুর্গাপুরে মুক্তিযোদ্ধার নিরব কান্না ও মানবেতর জীবন যাপন যেন দেখার কেউ নেই

আপডেটঃ 8:51 pm | March 28, 2016

Ad

কলি হাসান,দুর্গাপুর প্রতিনিধি : মুক্তির চেতনাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা আর এ মনোবল থেকে নিজের জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানী দোসর হানাদার বাহিনীর হাত থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার ল্েয যুদ্ধে যাপিয়ে পড়েন উপজেলার রামনগর গ্রামের ধীরেন্দ্র চন্দ্র দের চার পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের ৪র্থ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা অশ্বিনী চন্দ্র দে। ভাষার মাসের বুক ছিদ্র করে ১৯৫২ সালে ১১ই ডিসেম্বর কুমুদগঞ্জ রামনগরে মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে। গুজিরকোনায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিা শেষ করে নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে নির্মম নির্যাতন, অসম বৈষম্য শুরু করে পূর্ব পাকিস্তানের উপর পশ্চিম পাকিস্থান। প্রতিবাদী মুখর হয়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তানের যুব, বৃদ্ধ আবালবনিতা। মা বোনদের ইজ্জতের উপর চলে নির্যাতনের স্টিম রুলার। এই পৈশাচিক জুলুম, বৈষম্যের প্রতিবাদে দেশকে হানাদার বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত করার লে মাত্র ১৮ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে জাপিয়ে পড়ে অশ্বিনী চন্দ্র দে। জনৈক ভারতীয় সৈনিকের তত্ত্বাবধানে মেঘালয় রাজ্যের (তুরা) দ্বিতীয় ব্যাচের প্রশিনার্থী ছিলেন টগবগে যুবক অশ্বিনী চন্দ্র দে। এক মাস সাত দিন প্রশিণ সমাপ্ত করে কোম্পানী কমান্ডার ছিলেন আলতাব হোসেন। ট্রেনিং চলাকালীন সময়ে সহযোদ্ধাদের কথা এখনও স্পষ্ট বলতে না পারলেও অনেকের কথা যথেষ্ট চেষ্টার সমন্বয়ে বলা সম্ভব হয়েছে। যেমন- বীর মুক্তিযোদ্ধা অহিত চন্দ, আনোয়ার হোসেন, আব্দুল ছুবান, আব্দুল হক, আব্দুল খালেক, কানন সরকার সহ অনেকের নাম বলেও বলতে পারছেন না বাক মুক্তিযোদ্ধা অশ্বিনী চন্দ্র দে। বীর মুক্তিযোদ্ধা নিজের জীবনের মৃত্যু জেনেও যুদ্ধে যাপিয়ে পড়েন ১১নং সেক্টরে হানাদানার বাহিনীর দখলে থাকা তৎকালীন দুর্গাপুর থানার চারুয়াপাড়া, গোয়াতলা, বিরিশিরি, ঝানজাইল, নালিয়াকান্দা, দুর্গাপুর ও গৌরিপুরের কাশিগঞ্জ। পাকিস্তানী দোসরদের প্রতিহত করে ৬ই ডিসেম্বর স্বাধীন মুক্তির বার্তা নিয়ে দুর্গাপুর আগমন করেন অশ্বিনী চন্দ্র দে। মুক্তিযুদ্ধের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা ডুকরে ডুকরে কান্না করে প্রতিবেদক কে জানান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে একদিন কোম্পানী কমান্ডার আলতাব হোসেন এর বরাত দিয়ে গোপন সুত্রের মাধ্যমে জানতে পারলাম নালিয়াকান্দা এলাকায় পাকসেনারা আসবে। দিনটা ঠিক মনে পড়ছেনা, সূর্য পূর্ব দিকন্তে উকি দেওয়ার আগেই আমরা ৩২জন মুক্তিযোদ্ধা ভোর বেলায় নৌলাগিরি হতে রওনা করি নালিয়াকান্দার উদ্দেশ্যে। সূর্য ওঠার সাথে সাথে যখন নালিয়াকান্দায় পৌছলাম ঠিক তখনই এক মা বয়সী মহিলা আমাদের বিপরীত দিক হইতে দৌড়ে সামনে এসে দাড়ায়। মহিলাটি তখন বলল আমাদের বিপরীত হইতে পাক সেনারা আসিতেছে। তখনই আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলাম। আমাদের সামনে ছিল একটি রাস্তা, আনুমানিক ৪০/৪৫ গজ দূরত্বে পাক সেনারা অবস্থান করছিলেন। আমরা ঠিক রাস্তার বিপরীত দিকে অবস্থান নিলাম। তখনই পাকসেনাদের ল করে গুলি ছোরা আরম্ভ করলাম। যুদ্ধটা ছিল সম্মুখ যুদ্ধ। পাক সেনারা ছিল প্রায় ৮০/৯০ জন। আর আমরা মাত্র ৩২ জন। তাদের হাতে ছিল অনেক ভারী অস্ত্র, আর তাদের তুলনায় আমাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছিল অনেক কম। তবুও আমরা ভয় পাইনি, যুদ্ধ চলছে। কিছু সময় পর দেখা গেল আমাদের গোলাবারুদ প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে, আমাদের পিছু হটা ছাড়া আর কোন উপায় ছিলনা। তখনই আমরা কমান্ডারের কাছে ওয়ার্লেস করলাম আরও সহযোদ্ধা ও গোলাবারুদ পাঠানোর  জন্যে। সহযোদ্ধারা না আসা পর্যন্ত আমরা কিছুণ পর পর গুলি চালাতে লাগলাম। কারণ তখন আমাদের কাছে গুলি ছিল কম। আমাদের সহকর্মীরা আসা পর্যন্ত আমাদের কোন তি হয়নি। তবে আমাদের গুলিতে অনেক পাকসেনা নিহত হয়েছে। এক সময় পাকসেনারা আমাদের তিন দিক থেকে ঘেরাও করে ফেলেছে, ঠিক তখনই আমাদের সহযোদ্ধারা উপস্থিত হল। আমাদের আদেশ করা হল আমরা যেন ব্যারাকে চলে যাই। এই কথা বলে সহযোদ্ধারা পাকসেনাদের সাথে যুদ্ধ করতে লাগল এবং আমরা কলিং করে ব্যারাকে চলে গেলাম। আমরা পিছু হটতে লাগলাম, যারা আমাদের সহযোদ্ধারা এসেছিলেন সেই যুদ্ধে তাদের মধ্যে কয়েকজন শহীদ হন। সেই দিনটি ছিল আমার সবচেয়ে স্বরণীয় দিন, কারণ- ঐ মহিলা যদি আমাদের ঠিক সময় এই খবর না দিত তাহলে আমরা হয়ত পাক সেনাদের হাতে ধরা পরে যেতাম এবং মৃত্যুই ছিল আমাদের শেষ ভরসা। যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে দেশ গোছানোর কাজে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন শুরু হয় নতুন পথ চলা। আল বদর আর আল শামছ পাকিস্তানীর চর যারা বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে তাদের এককালীন মুক্তি ঘোষনা করে দিয়েছেন জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এক দিকে তৈরি হতে থাকে বা প্রস্তুত হতে থাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের  তালিকা। গেজেট প্রকাশ করা হয় অশ্বিনী চন্দ্র দে, যার মুক্তিবার্তা নং- ১৬১২।
বীর মুক্তিযোদ্ধা অশ্বিনী চন্দ্র দে ১৯৮৫ সালে সরস্বতী রাণী দে এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। নতুন করে পথচলা শুরু করেন। জীবন জীবিকার একমাত্র অবলম্বন পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া সামান্য ভিটি জমি, যা দিয়ে কোন রকমে সংসার চলত। আর মুক্তিযোদ্ধার মাসিক ভাতাও ছিল পরিবারের আয়ের অন্যতম একটি উৎস। সুন্দর পথ চলাই কাটা হয়ে দাড়ায় এক শ্রেণীর লোভ লালশা বাদী গোষ্ঠীর। ২০০১ সালের নির্বাচন চলাকালী সময়ে ১৫ই সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ২ ঘটিকার দিকে এই মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের উপর চলে নির্মম সন্ত্রাসী কর্মযজ্ঞ। মুখোসধারী একদল সন্ত্রাসী দরজা ভেঙ্গে ঘরে প্রবেশ করে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে মারপিট করে ৫ ভরি স্বর্ণের অলংকার ৩ ভরি রোপা, কাপড় চোপড়, আসবাবপত্র ও ৪২,০০০/- (বিয়ালিশ হাজার) টাকা লোপাট করে নিয়ে যায় মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা। লুটপাট করেও কান্ত হয়নি সন্ত্রাস বাহিনীরা, এমনকি রেহায় পাইনি বাড়িঘরের কোন একটি অংশও। সকল কিছু ভেঙ্গে তছনছ করে দিয়ে যায় সন্ত্রাসী দল। তখন মাথা গোজার জায়গা টুকুও পর্যন্ত ছিলনা মুক্তিযোদ্ধা অশ্বিনী চন্দ্র দে ও তার পরিবারের সদস্যদের। তখনকার সময়ে থানা পুলিশের কোন সহযোগিতাও পায়নি এই মুক্তিযোদ্ধা পরিবার। বীর মুক্তিযোদ্ধা আপে করে বলেন আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা এটাই ছিল আমার বড় অপরাধ। আমি যুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি ঠিকই কিন্তু একাত্তরের আলবদর বাহিনী ও তাদের দোসরদের কোন পরিবর্তন এখনও আসেনি ৪৪ বছর পরেও। আশ্রয়হীন অবস্থায় রামনগর থেকে কুলাগড়া ইউনিয়নে সহপাঠী বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে নিয়ে রবীন্দ্র সাহার বাড়িতে ৭ দিন আশ্রয় নেন অশ্বিনী চন্দ্র দে। বীর মুক্তিযোদ্ধা কষ্টের সংসারে হাল ধরার উপায় হিসেবে বেছে নেন একটি ফার্মে চাকুরী। বেতন হিসেবে যা পেতেন তা দিয়ে কোনমতে দুমোঠো ভাত খেয়ে অনাহারে অর্ধাহারে জীবন পাড়ি দিয়েছে। “কষ্টে যাদের জীবন গড়া তাদের আবার কষ্ট কিসের”এমন চরণ মুক্তিযোদ্ধার জীবনের নিত্য সঙ্গী। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালের ৭ই মার্চ মুক্তিযোদ্ধা অশ্বিনী দে এর জীবনে নেমে আসে আরেক কালো রাত। যার নাম ব্রেইন ষ্ট্রোক। জীবনের তরি থেমে যেতে যেতে অর্থের অভাবে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে বসত বাড়ির ভিটিটি বিক্রি করে দিতে হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা এক কালীন ৫০(পঞ্চাশ)হাজার টাকা পরিবারের হাতে তুলে দেন। চিকিৎসার তুলনায় তা অপ্রতুল। প্রায় ০৪ বছর যাবত বীর মুক্তিযোদ্ধা অশ্বিনী চন্দ্র দে দুর্গাপুরের সাধুপাড়াস্থ স্বপন মিয়ার বাসায় ভাড়ায় দুই মেয়ে ও এক ছেলে সন্তান নিয়ে ব্রেইনষ্ট্রোক, প্যারালাইসিস, বাক সমস্যা নিয়ে মানবেতরে জীবন যাপন করছেন।দেখার কি কেউ নেই….? মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী সরস্বতী রানী দে প্রতিবেদককে জানান আমার স্বামী প্রায় ০৫ বছর যাবত অসুস্থ, চিকিৎসাহীন অবস্থায় পড়ে আছে। প্রতি মাসে সাড়ে আট হাজার টাকার ঔষধ ও পরীা নিরীার প্রয়োজন হয়। সংসারের অবস্থা খুবই করুন। আমার সন্তানদের অর্থের অভাবে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি দাবী আমার স্বামীর চিকিৎসা ও সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া ও কর্মসংস্থানের ব্যাপারে সুদৃষ্টি আশাবাদী। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা কান্নাকন্ঠে প্রতিবেদককে জানান আমাদের লেখাপড়া ও সংসার খরচ যোগাতে মা একার পে অনেক কষ্ট হচ্ছে হোক, কিন্তু আমাদের বাবার চিকিৎসার ব্যবস্থা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি করুন। ডিগ্রী অধ্যয়নরত ২য় বর্ষের ছাত্রী অর্পণা রাণী দে আরও জানান আমার বাবা মহান মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে মাথার ডানপার্শ্বে গুলিবিদ্ধ হন। সেই ত নিয়ে এখনও তিনি বেচে আছেন, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা যোগায়। আমার বাবা আমাদের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত কিংবদন্তী আর বাবার সন্তান হিসাবে অর্থের অভাবে চিকিৎসা করতে না পারার কষ্ট আমি মেয়ে হিসেবে মেনে নিতে পারছি না।

ব্রেকিং নিউজঃ