| |

মৌলবাদ, জঙ্গী ও দুস্কৃতিকারিদের হামলার ভয়ে সময়ের শৃঙ্খলে বেঁধে পালিত হচ্ছে পহেলা বৈশাখের উৎসব

আপডেটঃ 8:59 pm | April 13, 2016

Ad

প্রদীপ ভৌমিক : আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলাদেশের সমতল ও পাহাড়ী জনগোষ্টির জীবনে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে এই দিনটি। বাংলাদেশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠির প্রানের উৎসব এই পহেলা বৈশাখ। বছরের এই দিনটিতে বাঙ্গালীরা পুরাতন বছরের দেনা পাওনার হিসাব মিটিয়ে শুরু করে নতুন দিনের পথযাত্রা। পহেলা বৈশাখের প্রথম দিনটিকে অবলম্বন করে বাংলাদেশের মানুষ সমস্ত প্রকার গানি ব্যার্থতা ভুলে গিয়ে আগামী দিনের আনন্দময় যাত্রা শুরু করার জন্য মেতে উঠে উৎসবের আনন্দে। ভুলে যায় জীবনের দু:খ ও বেদনাকে। বৎসরের শেষ দিন ৩০ চৈত্রের মধ্যে বাঙ্গালী ব্যাবসায়ীরা তাদের গ্রাহক ও পাওনাদারদের সাথে দেনা পাওনার হিসাব নিকাশ শেষ করে ফেলে। পহেলা বৈশাখের দিন সকাল থেকে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, কুশল বিনিময় মিষ্টি বিতরন করা থেকে শুরু করে গভীর রাত্র পর্যন্ত চলে বাঙ্গালীর কৃষ্টি ও সাংস্কৃতির অনুষ্ঠান । যুবক বৃদ্ধ থেকে শুরু করে নারী পুরুষরা নেচে গেয়ে আনন্দের জোয়ার বয়ে দেয় বাঙ্গালীর জীবনে। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, থেকে শুরু করে সমস্ত জাতীস্বত্তা যেন এক মোহনায় এসে মিলে মিশে সর্ব প্রকার ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একাকার হয়ে যায়। থাকেনা কোন ধর্মীয় বিভাজন। তৈরি হয় এক জাতীর এক দেশ বাঙ্গালীর বাংলাদেশ। বিশ্বকবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাই “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো” বলে আহবান করে ছিলেন বাঙ্গালী জাতীর জীবন থেকে জরাজীর্ন মুছে ফেলার জন্য।
বাঙ্গালীর জাতীয় জীবনে পহেলা বৈশাখ এক অপরিহার্য দিন। যুগ যুগ ধরে বাঙ্গালীরা এই দিনটিতে ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এক জাতী হিসাবে নিজেদেরকে উপস্থাপন করে। শপথ নেয় সাম্প্রদায়িকতা, স্বৈরাচার ও সামাজিক বিভেদের বিরুদ্বে।
বাংলাদেশের সমতল কিংবা পাহাড়ী জাতীগোষ্ঠি যখন ব্যাস্ত জাতীর এই প্রানের উৎসবকে বরন করে নিতে ঠিক সেই মুহুর্তে বাংলাদেশের স্বরাষ্টমন্ত্রীর উৎসব নিয়ে কিছু ঘোষনা আমাদেরকে বিব্রত করেছে। স্বরাষ্টমন্ত্রী ঘোষনা করেছেন, বিকেল ৫ টার মধ্যে প্রকাশ্য স্থানে শেষ করতে হবে পহেলা বৈশাখের সব আয়োজন। মঙ্গল শোভাযাত্রায় ব্যাবহার করা যাবেনা কোন মুখোশ। তবে মুখোশ বহন করে নিয়ে যাওয়া যাবে। বাঁজানো যাবেনা ঘু ঘু জেলা বাঁশিটি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ ঘোষনায় মনে হয় উৎসবে আইন শৃংঙ্খলা রায় হয়তবা উনার প্রশাসন ব্যার্থ হতে পারে এই ধারনা থেকেই উনি এই সিন্ধান্ত দিয়েছেন। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি বিষয়ের সাথে আমরা একমত আফ্রিকার আনন্দ উৎসবে ব্যবহৃত এই বাঁিশটির তীব্র আওয়াজ শোভাযাত্রায় অংশ গ্রহনকারীদের মাঝে বিরক্তির সৃষ্টি করে। স্বরাষ্টমন্ত্রী হয়ত জানেন না সর্ব ধর্মের বাঙ্গলীরা সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজ নিজ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটির শুভ সুচনা করে। অধিকাংশ বাঙ্গালী পরিবারে আত্বীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধবরা একসাথে মিলে দুপুরে আহার করেন। তারপর সবাই মিলে এক সাথে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ব্যাবসায়ীরা ও তাদের ভোক্তারা বিভিন্ন দোকানে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করে। ৫ টার ভিতরে এসব কর্মকান্ড শেষ করার আদেশটিকে মনে হয় সময়ের শৃংঙ্খলে আবদ্ব করা হয়েছে পহেলা বৈশাখের কর্মসুচীকে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে উৎসবের সব কর্মে যোগদান করা কঠিন ব্যাপার বলে মনে হয়। চিরাচরিত নিয়মকে সংকুচিত করে ব্যাক্তি স্বাধীনতা হরন করা হয়েছে। বৈশাখের আনন্দ স্রোতকে প্রতিবন্ধকতা করে প্রশাসনের শৃংঙ্খলে আবদ্ধ করা। মৌলবাদী দুস্কৃতিকারিদের কাছে আত্ম সমর্পন করা যা মৌলবাদীরা দীর্ঘদিন যাবত কামনা করে আসছে। বাঙ্গালীর প্রানের উৎসব পহেলা বৈশাখের উপর নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে মৌলবাদীদের অপকর্মের হাত থেকে বাঁচতে ব্যার্থ হয়ে হয়তবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংপ্তি করলেন পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানমালাকে। এটাকে আমরা যারা বাংলা ও বাঙ্গলীর সাংস্কৃতিতে বিশ্বাস করি তাদের পরাজয় বলে মনে করি। যদি এই পরাজয়কে মেনে নেই তবে আগামীতে হয়তবা মৌলবাদীদের হুমকিতে বাংলাদেশের বাঙ্গালীদের ঘরের বাইরে এসে আর পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান করা যাবে না। যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বর্তমান ঘোষনায় ঘর অথবা দেয়াল ঘেরা জায়গায় অনুষ্ঠান করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন সরকারী কর্মচারি কর্মকর্তাদের বৈশাখী ভাতা দিচ্ছেন সেই সময় বৈশাখী অনুষ্ঠানকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সংপ্তি করার আদেশ বাঙ্গালী জাতীকে বিস্মিত করেছে।
পহেলা বৈশাখকে বাঙ্গালীরা একটি অসাম্পদায়িক উৎসব বলে মনে করে। এই দিনে বাংলা ও বাঙ্গালীর কৃষ্টি লোকঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিকে সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরা হয়। বাঙ্গালীর জাতীয় জীবনে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এই রেওয়াজটি চলে আসছে। গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র এই উৎসবটি পালিত হয় সার্বজনীন ভাবে। গ্রামীন ঐতিহ্যকে ধারন করে শহরেও আয়োজন হয় বৈশাখী মেলার। মাটির তৈযশপত্র, পুতুল, বাঁশবেতের গৃহস্থালী সামগ্রী, বাচ্চাদের খেলনা থেকে শুরু করে সব কিছুই পাওয়া যায় বৈশাখী মেলায়। গ্রামীন জনপদের সাধারন মানুষ সারা বৎসর অপোয় থাকে বৈশাখী মেলা থেকে তাদের গৃহস্থালী ও প্রয়োজনীয় সখের সামগ্রী কেনার জন্য। বাচ্চারা তাদের পছন্দের সামগ্রী কিনে এই মেলা থেকে। তাই বাঙ্গালীর জাতীয় জীবনে গ্রাম থেকে শহর, সমতল থেকে পাহাড়ী সমস্থ জাতী সত্বার সাথে মিশে আছে বৈশাখী মেলা। আর সেই মেলাকে কোন প্রকার বিধি নিষেধ দিয়ে বিচ্ছিন্ন করা যাবেনা বাঙ্গালীর জীবন থেকে।  অতীতেও বাঙ্গালী জাতীর সাংস্কৃতি ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক জীবনধারার উপর জঙ্গি, মৌলবাদী ও সন্ত্রাসীরা ভয়ভীতি দেখিয়ে আক্রমন করে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছে।
কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। এদেশের ইতিহাসে আছে পাকিস্থান আমলে যখন রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করা হয়েছিল বাঙ্গালী জাতী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা তা মানেনি। রমনার বটমুলে ছায়ানটের বর্ষবরন অনুষ্ঠানে মৌলবাদীরা যখন গ্রেনেট চার্জ করে মানুষ হত্যা করে ভয় দেখিয়ে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানকে বাংলাদেশে চিরদিনের জন্য বন্ধ করতে চেয়েছিল, বাঙ্গালী জাতী তা করতে দেয়নি। উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালিয়ে মানুষ হত্যা করে পন্ড করে দিয়েছিল অনুষ্ঠান। কিন্তু শোক থেকে শক্তি সঞ্চয় করে এখনও চালিয়ে যাচ্ছে অনুষ্ঠান। কোনও ভয় তাকে রুখতে পারেনি। যতদিন বাঙ্গালী জাতী থাকবে ততদিন এই পহেলা বৈশাখ অনন্তকাল ধরে টিকে থাকবে জাতীয় জীবনে। কোন শৃংঙ্খল একে বাধা গ্রস্থ করতে পারবে না। রাষ্ট্র অথবা কোন সরকার যদি বাঙ্গালী জাতীর এ প্রানের উৎসবকে নিরাপত্তা দিতে ব্যার্থ হয় তবে সমগ্র বাঙ্গালী জাতী একে নিরাপত্তা দিবে অতীতের অন্যান ঘটনার মত। আমরা বিশ্বাস করি এ প্রজন্মের সাথী বন্ধুরা তাদের পুর্বপুরুষদের শিা ও সাংস্কৃতিকে ধারন করে যাবে, নস্যাত হতে দেবেনা কোন দিন। বুকের রক্ত দিয়ে হলেও পুর্বপুরুষদের মত রা করবে বাঙ্গালী জাতীর কৃষ্টি ও সাংস্কৃতিকে। এই প্রত্যাশা করি আগামী বছরে সময়ের শিকলদিয়ে বন্দি করে নয়, মুক্তভাবে পালিত হবে বর্ষবরন অনুষ্ঠান।

ব্রেকিং নিউজঃ