| |

ময়মনসিংহ পুলিশ লাইনে শহীদ পুলিশ সদস্যদের স্মরনে কোন স্মৃতিসৌধ নেই আছে পুলিশ সদস্যদের স্মরনে স্মৃতি ফলক

আপডেটঃ 12:45 am | September 05, 2016

Ad

প্রদীপ ভৌমিক ॥ কথা হচ্ছিল শহীদ শশাঙ্ক সেন গুপ্ত মজুমদারের নাতনী সানন্দা সেন গুপ্ত টুম্পার সাথে। তিনি বলছিলেন আজ থেকে ৪৫ বছর পুর্বে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আমার দাদু শহীদ শশাঙ্ক সেন গুপ্ত মজুমদার ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ অফিসে কর্মরত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করে শহীদ হয়ে ছিলেন। আমার দাদুকে আমি চোখে দেখিনি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ের তার অনেক গল্প শুনেছি। ৭১এর স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকবাহিনী ও তার দোসরদের দ্বারা নির্মম ভাবে শহীদ হয়ে ছিলেন তিনি। আমার ঠাকুর মা দিপালী সেনগুপ্ত, আমার বাবা, পুলিশে চাকুরীরত আমার দাদুর সহকর্মী ও এলাকার লোকজনের কাছ থেকে দাদুর বীরত্বের অনেক কথা শুনেছি। আমার ঠাকুর মা তার স্বামী শহীদ শশাঙ্ক সেন গুপ্তকে হারানোর ব্যাথা বুকে ধারন করে নিরবে অশ্র“ বিসর্জন করেছেন আর ভেবেছেন কবে পাবে তার পরিবার শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সম্মান। এই স্বাধীন দেশটার কাছে প্রত্যাশা করেছেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করেও তার বড় ছেলে পুলিশে কর্মরত স্বপন সেন গুপ্ত পায়নি মুক্তিযোদ্ধার সম্মান সে কবে পাবে তার স্বীকৃতি। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার ঠাকুর মার জীবিত থাকাকালীন সময়ে তার সেই ইচ্ছা পুরন হয়নি। একবুক বেদনা ও আশা নিয়ে তিনি চলে গেছেন পরলোকে। শুধু আমার ঠাকুর মা নয় সেই সময়ের আমার দাদুর সাথে কর্মরত পুলিশ সদস্য যারা মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়ে ছিলেন তাদের উত্তরসুরীরাও এই দু:খ ও বেদনা নিয়ে আজও বেঁেচ আছেন কবে মিলবে তাদের শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি। আমরা যতদুর জানতে পেরেছি ময়মনসিংহ পুলিশ লাইনে শহীদ পুলিশ সদস্যদের স্বরনে আতœত্যাগকারী মুক্তিযোদ্ধা পুলিশদের নাম সম্বলিত কোন স্মৃতিস্তম্ভ অদ্যাবদি নির্মিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পুলিশ সদস্যদের পরিবার ও শুভাকাঙ্কীরা আজো এ আশা নিয়ে বেঁেচ আছে আগামী প্রজন্মের কাছে শহীদদের স্মৃতিকে স্মরনীয় করে রাখার জন্য ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ প্রশাসন একটি স্মৃতিসৌধ নির্মান করবে। আমি আমার বাবা স্বপন সেন গুপ্তের কাছে শুনেছি বর্তমান রেঞ্জ ডিআইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন ও জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তা ছাড়া পুলিশ সুপার নিজেও একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। উনাদের উপর এ প্রজন্মের আশা ও বিশ্বাস অনেকের চাইতে বেশি। আমরা বিশ্বাস করি উনারা উদ্যোগ নিয়ে আমাদের পুর্ব পুরুষদের স্মৃতিরক্ষায় পুলিশ লাইনে একটি শহীদ পুলিশ সদস্যদের স্মরনে স্মৃতিসৌধ নির্মান হবে। আমাদের বিশ্বাস শহীদদের পুর্বসুরীদের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। আমার সাথে আলাপচারিতায় এই কথা গুলো বলছিল বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদ শশাঙ্ক সেন গুপ্তের নাতনি ও স্বপন সেন গুপ্তের মেয়ে সিবিএমসিতে ফাইনাল বর্ষের ছাত্রী সানন্দা সেন গুপ্ত টুম্পা। তার সেই আবেগময় কথাগুলো শুনে আমি একজন স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে নিজকে অপরাধী মনে হচ্ছিল। কেন আমরা অথবা ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ প্রশাসন শহীদদের স্মৃতি রক্ষার জন্য একটি স্মৃতিসৌধ নির্মান করতে পারলাম না। ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ লাইনে আমি অনুসন্ধান চালিয়ে সানন্দা সেন গুপ্তা টুম্পার কথার সত্যতা খুজে পেলাম। সেখানে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করে যে সমস্ত পুলিশ সদস্যরা শহীদ হয়ে ছিল তাদের স্মরনে কোন স্মৃতিসৌধ নেই। আছে জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বীরমুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে তৎকালীন সময়ে যারা সশ্রস্ত্র বিদ্রেুাহ করে ছিল ঘাতক সরকারের বিরোদ্ধে তাদের সাথে যুদ্ধে যে সমস্ত পুলিশ সদস্য নিহত হয়ে ছিল তাদের স্মরনে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। স্মৃতিস্তম্ভটির নির্মানকাল ১৯৭৬ সাল অথবা তার পরবর্তী সময়ে। তখন জেলা পুলিশ সুপার ছিলেন তালেব আলী। দু:খ জনক হলেও সত্য মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীর পুলিশ সদস্যদের স্মরনে স্মৃতিস্তম্ভ না থাকলেও বঙ্গবন্ধুর হত্যার ঘাতকদের আদেশ পালন করতে গিয়ে যে সমস্থ পুলিশ সদস্য নিহত হয়ে ছিলেন তাদের স্মরনে স্মৃতিস্তম্ভ আছে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ লাইনে। বাংলাদেশ পুলিশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের ভুমিকা ভাবতে গেলেই স্মৃতিতে ভেসে উঠে ১৯৭১ এর ২৫শে মার্চ রাত্রে যখন পাকিস্থান বাহিনী ট্যাংক, কামান ও সাজোয়া যান নিয়ে রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাক আক্রমন করে স্বাধীনতাকামী বাঙ্গালী পুলিশ সদস্যদেরকে নিশ্চিন করার জন্য। বীর বাঙ্গালী রাজারবাগের পুলিশরাও হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম স্বশস্র যুদ্ধ শুরু করে। সেই যুদ্ধে শহীদ হন শত শত বাঙ্গালী পুলিশ। এমনি এক সংকটময় সময়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সাহসী পুলিশ সদস্য আব্দুল খালেক পুলিশের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে ময়মনসিংহ সহ তৎকালীন পুর্ব পাকিস্থানের সমস্ত পুলিশ ষ্টেশন ও লাইনে একটি ওয়্যারলেস বার্তা পাঠান। বার্তটিতে ছিল “বেইজ অফ অল স্টেশন অফ ইস্ট পাকিস্থান পুলিশ কিপ লিসেনিং ওয়াচ উই আর অলরেডি এটাক্ট বাইদ্যা পাক আর্মী ট্রাই টু সেড ইউর সেলফ ওভার” রাত ১১.৩০ মিনিটে। এই ওয়াল্যাস মেসেজটি ময়মনসিংহ সহ সারা দেশের পুলিশ সদস্যদের মাঝে উত্তেজনার সৃষ্টি করে। পুলিশ সদস্যরা সিদ্ধান্ত নেয় তারা তৎকালীন পাকিস্থান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রুহ ঘোষনা করার। ময়মনসিংহের পুলিশ সদস্যরাও ছাত্র শ্রমিক জনতাকে রাজারবাগ পুলিশ লাইন পাকবাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার খবরটি পৌছে দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহন করার জন্য আহবান জানায়। এ ব্যাপারে তৎকালীন পুলিশ লাইন হাই স্কুলের হেড শিক্ষক একেএম শামসুল আলম অগ্রনী ভুমিকা পালন করেন। তিনি স্থানীয় ছাত্র যুবক ও আওয়ামীলীগ নেতা কর্মীদেরকে থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি একটি কোম্পানীর অধিনায়ক হন। যার নাম ছিল আলম কোম্পানী। এস ফোর্সের লে: কর্নেল এম শফিউল্লাহর কাছ থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধে ময়মনসিংহ পুলিশের ভুমিকার স্বীকৃতি পাওয়া যায়। তিনি উল্লেখ করেন ময়মনসিংহ পুলিশের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযুদ্ধে যোগদান ও পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রেুাহের কথা দেশবাসীকে অবহিত করার সুযোগটি করে দিয়ে ছিল ওয়ারলেসের ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের সদস্যরা। বীরমুক্তিযোদ্ধা এম শফিউল্লাহ পরবর্তীতে মেজর জেনারেল হয়ে স্বাধীন বাংলার সেনা প্রধানের দ্বায়িত্ব পালন করেছেন। সারাদেশে ১৪হাজার পুলিশ সদস্য স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদেন তার মধ্যে ১১শত জন শহীদ হন। যার মধ্যে ২৩জন ময়মনসিংহের পুলিশ সদস্য ছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ থাকে যে, ময়মনসিংহের পুলিশ লাইনে কর্মরত ৪৯জন পুলিশ বিভিন্ন সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করে। এর মধ্যে ২৩জন পুলিশ সদস্য শহীদ হয়ে ছিলেন তারা ছিলেন ১. মো: নাজির হোসেন, এএসআই, শহীদ হওয়ার তারিখ ১৩.০৫.১৯৭১। ২. মো: শফিউদ্দিন ভুইয়া, এএসআই, শহীদ হওয়ার তারিখ ১৫.০৫.১৯৭১। ৩. নাছির আহমেদ, হাবিলদার/১৯৯৩, শহীদ হওয়ার তারিখ ১৮.০৪.১৯৭১। ৪. আন্না মেহেরবান, হাবিলদার/১৪৯১, শহীদ হওয়ার তারিখ ১৮.০৪.১৯৭১। ৫. ইসরাইল খান, হাবিলদার/১৪৬৫, শহীদ হওয়ার তারিখ ২১.০৩.১৯৭১। ৬. শেখ আলী (বোর), হাবিলদার/২১১০,  শহীদ হওয়ার তারিখ ১৭.০৪.১৯৭১ । ৭. হারিচুল ইসলাম, হাবিলদার/২১১০, শহীদ হওয়ার তারিখ ২১.০৮.১৯৭১। ৮. মো: আমীর খান, কং/৮০৬, শহীদ হওয়ার তারিখ ১৮.০৪.১৯৭১। ৯. মো: হোসেন, কং/১৩৮৭, শহীদ হওয়ার তারিখ ১৮.০৪.১৯৭১। ১০. মো: সেদি, কং/১৩৩২, শহীদ হওয়ার তারিখ ১৮.০৪.১৯৭১। ১১. মো: আলী রেজা, কং/২১৪৬, শহীদ হওয়ার তারিখ ১৮.০৪.১৯৭১। ১২. আব্দুর রেজ্জাক, কং/১৪৬৮, শহীদ হওয়ার তারিখ ১৮.০৪.১৯৭১। ১৩. আব্দুল হামিদ খান, কং/২২৮২, শহীদ হওয়ার তারিখ ১৮.০৪.১৯৭১। ১৪. কাজী ফজলুল হক, কং/২৮২৯, শহীদ হওয়ার তারিখ ২১.০৫.১৯৭১। ১৫. ফকির আবুল কালাম, কং/২৫০৮, শহীদ হওয়ার তারিখ ১৭.১০.১৯৭১। ১৬. মোবারক হোসেন, কং/১৬৯৪, শহীদ হওয়ার তারিখ ০৫.০৭.১৯৭১। ১৭. আলী আকবর, কং/৩০৯৮, শহীদ হওয়ার তারিখ ০৫.০৭.১৯৭১। ১৮. তোজাম্মেল আলী, কং/১২৬৬, শহীদ হওয়ার তারিখ ০৪.১০.১৯৭১। ১৯. তাজুল ইসলাম, কং/২৭৮৪, শহীদ হওয়ার তারিখ ১৫.০৬.১৯৭১। ২০. শশাঙ্ক সেন মজুমদার, এলডিএ, শহীদ হওয়ার তারিখ ২২.০৯.১৯৭১। ২১. মো: ইজ্জল, রেশন স্টোর সহকারী, শহীদ হওয়ার তারিখ ১৮.০৪.১৯৭১। ২২. জামাল উদ্দিন, কং/৬৩০, শহীদ হওয়ার তারিখ ১৭.০৪.১৯৭১। ২৩. ওয়াহেদ বক্স, কং/৮৫৪, শহীদ হওয়ার তারিখ ২৯.০৪.১৯৭১। আমরা যারা স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাস করি তারা মনে করি ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ প্রশাসন যদি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকহানাদার বাহিনী দ্বারা শহীদ বীরমুক্তিযোদ্ধা পুলিশ সদস্যদের স্মৃতিরক্ষার জন্য কোন উদ্যোগ গ্রহন করে আমাদের সীমিত ক্ষমতার মধ্য থেকেও জেলা পুলিশ প্রশাসনকে সহযোগিতা করার আশা পোষন করি যদি পুলিশ প্রশাসন প্রয়োজন মনে করেন।
পরবর্তী সংখ্যায় ময়মনসিংহ পুলিশ লাইনের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যে সমস্ত সেক্টরে উনারা স্বাধীনতার পক্ষে যুদ্ধরত ছিলেন ও শহীদ হয়ে ছিলেন তার বিস্তারিত বিবরন পাঠকদের সামনে তুলে ধরব।

ব্রেকিং নিউজঃ