| |

গ্রীষ্মকালীন পরিযায়ী ‘খয়রাপাখ পাপিয়া’র জন্মস্থান বাংলাদেশ

আপডেটঃ 5:12 am | September 20, 2016

Ad

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার): ‘বিশ বছর আগে শ্রীমঙ্গলে প্রবেশের মুখে গ্রীষ্মকালের এই পরিযায়ী পাখিটিকে প্রথম দেখেছিলাম আমি। তখন আর এতো দোকানপাট, দালানকোঠা ছিল না; সারি সারি গাছ ছিল। গাছের ডালে নিজেকে আড়াল করে রেখেছিল সে। অপূর্ব এই পাখিটিকে দেখা আমার জীবনের বড় এক প্রাপ্তি।’

এ কথা বলেছেন বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রখ্যাত পাখি গবেষক, লেখক ইনাম আল হক।

পাখির নাম ‘খয়রাপাখ পাপিয়া’। ইংরেজি নাম Chestnut-winged Cuckoo। এরা মাঝারি আকারের কোকিল পাখির মতো দেখতে অনেকটা! এটি আমাদের দেশের দুর্লভ পরিযায়ী পাখি। শুধু দুর্লভ শব্দটি বললে কিছুটা ভুল বলা হবে। বলতে হবে ‘অতি দুর্লভ’। কারণ সে গাছের ডালে নিজেকে প্রতিমুহূর্তে আড়াল করে রাখে।

পাখিটিকে দেখলে মন ভরে যায়। মাথায় রয়েছে রাজকীয় ঝুঁটি। দীর্ঘদেহ আর ঝুঁটিময় মুকুট তাকে দিয়েছে সৌন্দর্য আর শ্রেষ্ঠত্বের গৌরব। ‘পীপ-পীপ…’ পীপ-পীপ…’ স্বরে চেঁচিয়ে ডাকে এই কোকিল পরিবারের পাখিটি।

বাংলানিউজের সাথে এই বিশেষ পাখিটিকে নিয়ে দু’-দশক পূর্বের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কিছুটা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বরেণ্য পাখিবিদ ইনাম আল হক।

তিনি জানান, বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালে হাতেগোনা যে আট-দশটি পরিযায়ী পাখি দেখা যায়, তারমধ্যে খয়রাপাখ পাপিয়া বৃহৎ এবং খুবই সুন্দর পাখি। মূলত এরা গ্রীষ্ম, বর্ষা এবং শরৎকাল পর্যন্ত আমাদের দেশে অবস্থান করে। কারণ বর্ষাকালে প্রচুর শুঁয়োপোকা হয়। ওরা শুঁয়োপোকা ধরে ধরে খায়।

তবে এরা শীতকালে আর আমাদের দেশে থাকে না। কারণ শীতকালে শুঁয়োপোকা পাওয়া যায় না বলে তাদের খাবারের অভাব দেখা যায়। অন্যদেশের উদ্দেশ্যে ডানা মেলে। এরা আমাদের দেশে গ্রীষ্মকালে অন্যপাখির বাসায় যেমন- ছাতারে (Babbler) পাখির বাসায় ডিম পাড়ে। নীল রঙের দু-চারটি ডিম পাড়ে। কিন্তু সে নিজে সেই ডিমে তা দেয় না। কিছুদিন পর বাচ্চা ফুটে। তবে উল্লেখ্যযোগ তথ্য হলো, খয়রাপাখ পাপিয়াদের সবার জন্মস্থান বাংলাদেশে।

পাখিটির শারীরিক গঠন ও অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, এরা দৈর্ঘ্য ৪৭ সেমি এবং ওজন ৭০ গ্রাম। শরীর জুড়ে পীতাভ, হালকা লাল আর সাদা রঙের আভা বেশি ছড়ানো। চোখ লালচে-বাদামি। মসৃণ কালো মাথায় লম্বা ঝুঁটি পিছনের দিকে কাত হয়ে পড়ে থাকে। চির সবুজ বন বা আদ্র পাতাঝরা বনে একা, জোড়ায় কিংবা তিন-চার পাখি একত্রে বিচরণ করে।

ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, চীন ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া থেকে ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি দেশে তাদের বৈশ্বিক বিচরণ রয়েছে বলে জানান এই গবেষক।

ছবিতে ইনাম আল হককে খয়রাপাখ পাপিয়ার পায়ে রিঙ পড়াতে দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের উদ্যোগে প্রতি বছরের নির্দিষ্ট একটি সময়ে বাংলাদেশের বিশেষ কয়েকটি এলাকায় চলে রিঙগিঙ কার্যক্রম।

এ পাখিটির পায়ে রিঙ পড়ানোর উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, পাখিগুলোর পায়ে রিঙ পড়ানো হয় দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার জন্যে। অর্থাৎ সে কত বছর বাঁচে? কোথা থেকে কোথায় যায়? পরিযায়ী পাখিদের পায়ে রিঙ পরালেই কেবল বোঝা যায়, কোন দেশ থেকে কোন দেশে সে যাচ্ছে, কোন সময়ে? অথবা কত দিন পর পর সে ফিরে আসছে? একই জায়গায় ফিরে আসছে কি না? ইত্যাদি অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।

ষুদ্রাকার এই রিঙ এর গায়ে দেশের নাম কোড নামসহ একটি নম্বর থাকে। সুতরাং প্রতিটি পাখিকে চেনা যায় বুঝা যায়। যেমন ধরুন, পাখিটা আমি শ্রীমঙ্গলে দেখেছিলাম, সে প্রতি বছর শ্রীমঙ্গলে ফিরে আসে কি না? আমরা জানি যে, খয়রাপাখ পাপিয়ার প্রজাতিরা প্রতি বছর গ্রীষ্মকালে শ্রীমঙ্গলে আসে। কিন্তু সেই একই পাখিই কী আসে – এ তথ্যগুলো রিঙ এর মাধ্যমে জানা যায়।

এছাড়াও মনে করুন, গ্রীষ্মকালে রিঙ পরিহিত খয়রাপাক পাপিয়া একবার হয়তো শ্রীমঙ্গলে এলো।  দ্বিতীয় বছর সে কি শ্রীমঙ্গলে এলো? নাকি রাঙামাটি অঞ্চলে চলে গেল? এ প্রশ্নগুলোর জবাব রিঙ এর মাধ্যমেই আমরা জানতে পারি।

সুত্র বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ব্রেকিং নিউজঃ