| |

মালাউন শদ্বের অপপ্রয়োগ বিবেকবর্জিত মানুষের কাজ

আপডেটঃ 4:12 pm | September 25, 2016

Ad

প্রদীপ ভৌমিক ॥ আমরা অনেক শদ্ধ ব্যবহার করি সচেতন বা অসচেতন ভাবে যা অন্যকে অপমানিত অথবা ব্যাথিত করে । এমনি একটি শব্ধ “মালাউন”। মালাউন শব্ধটি এসেছে আরবীভাষা থেকে। এদেশে মালাউন শব্ধটি ব্যবহার হয়েছে ১৯৪৭এর পর অর্থাৎ ভারত বিভক্তির পরবর্তী সময়ে। সাম্প্রদায়িক মনমানসিকতায় বিশ্বাসী ব্যাক্তিবর্গের মাধ্যমে ব্যাপক ভাবে। পাকিস্থান সৃষ্টির পর বেশির ভাগ উর্দুভাষী পাকিস্থানীরা হিন্দুদেরকে “মালাউন” বলে অখ্যায়িক করত। “মালাউন” শব্ধটি ১৯৭১সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্থান সেনা বাহিনী ও তার দোসরদের মাঝে ব্যাপক ভাবে ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। পাকহানাদার বাহিনী হিন্দুদেরকে হিন্দু না বলে “মালাউন” শব্ধ ব্যবহার করত। এরা কখনও বৌদ্ধ, খৃষ্টানদের ক্ষেত্রে “মালাউন” শব্ধটি ব্যবহার করতনা। হিন্দু অধ্যুষিত ভারত যেহেতু মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সর্বাত্বক সহযোগিতা করেছিল তাই হিন্দুদের ক্ষেত্রে এরা ব্যাঙ্গার্থে তুচ্ছার্থে বা চরম ঘৃনা প্রকাশার্থে “মালাউন” শব্ধটি হিন্দুদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে। বাংলাদেশে আজও যারা পাকিস্থানী সাম্প্রদায়িক মানসিকতায় বিশ্বাসী তারা আজও “মালাউন” শব্ধটিকে তাদের মানসিকতার মত বিকৃত করে ”মালোয়ান” কোথাও কোথাও তীব্রতম ঘৃনা ও ইর্ষার প্রকাশ ঘটিয়ে “মালু” শব্ধটি চালু করেছে যা একজন সামান্যতম বিবেক, হৃদয়বান ও ব্যাক্তিত্ববান মানুষকে ব্যাথিত না করে পারেনা। “মালাউন” শব্দটির অর্থ নিরূপনে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত বাংলা ভাষায় “ আরবী, ফার্সী, তুর্কি, হিন্দী, উর্দু শব্দের অভিধান” গ্রন্থে “মালাউন” শব্ধটিকে প্রথমত মাল‘উন বানানে দেয়া হয়েছে। যার অর্থ “অভিশপ্ত” “বিতারিত” এবং দ্বিতীয় অর্থ দেয়া হয়েছে “শয়তান”। তৃতীয় অর্থ দেয়া হয়েছে মুসলমান কর্তৃক ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোককে দেয়া গালি বিশেষ। কাজী রফিকুল হকের অভিধানে “মালাউন” শব্ধের অর্থ দেয়া হয়েছে আরবী শব্ধ “শয়তান” যার অর্থ আল্লাহদ্রেুাহী ফেরেশতা, পাপাত্বা, অতিশয় দুর্বৃত্ব, বদমায়েশ ইত্যাদি। এদেশে কি হিন্দুরা মানুষের কাছে এসব নেতিবাচক বিশেষনের উপযুক্ত, নিশ্চয়ই নয়। বাংলাদেশের হিন্দুরা বাংলাদেশের মাটির সন্তান। ইসলাম প্রচারের কয়েক সহস্রবছর আগে থেকেই তারা এখানে বসবাস করছে। ইসলাম প্রচারের পর হিন্দু, মুসলমান সব ধর্মের অনুসারী সাধারন মানুষ একে অন্যের সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহন করে সুখে শান্তিতে বসবাস করছে। ধর্ম পালনটা যার যার ব্যাক্তিগত হলেও উৎসবটা ছিল সবার। সুতরাং “অভিশপ্ত” বা “বিতারিত”র মত নিকৃষ্ট অর্থে হিন্দুদেরকে নয় বরং সাম্প্রদায়িক মনোভাবদুষ্ট সংকীর্ন মানুষদেরকেই উল্টো “মালাউন” অভিধায় চিহ্নিত করা যেতে পারে। হিন্দুরা কখন কার দ্বারা কোথায় অভিশপ্ত হল এবং বিতারিত হল কাদের দ্বারা কোন জায়গা থেকে তার কোন প্রমান ইতিহাসে নেই। তাই হিন্দুদের ক্ষেত্রে “মালাউন” শব্ধটি প্রযোগ্য নয়। তবেকি হিন্দুরা নীচমনোভাব সম্পন্ন সেই সব ব্যাক্তিদ্বারা অভিশপ্ত হল এবং নিজ বাসভূমি থেকে বিতারিত হল বিধায় যাদের দ্বারা এই কাজটি সম্পন্ন হয়েছে তাদের কাছে হিন্দুরা “মালাউন”। অভিধানে “মালাউন” শব্দের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অর্থ রয়েছে “কাফের” আরবী শব্ধ “কাফির” যার অর্থ প্রত্যাখ্যানকারী, ইসলাম ধর্ম অস্বীকারকারী, ইসলাম বিরোধী ইত্যাদি। এদেশে হিন্দুরা ইসলাম বিরোধী বা অস্বীকারকারী তো নয়ই সত্য প্রত্যাখ্যানকারীও নয়। কারন হিন্দু ধর্মই বহুমতে বিস্বাসী ধর্ম। এখানে হিন্দুরা বিভিন্ন প্রতিমা ও দেবতার পুঁজা করলেও অন্য দেবতার প্রতি তাদের কোন অবজ্ঞা বা অশ্রদ্ধা নেই। সব দেতাদের প্রতি তাদের সমান শ্রদ্ধা। রামকৃষ্ণমঠ ও মিশনের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “ যত মত তত পথ” তিনি এর মধ্য দিয়ে সমস্ত ধর্ম ও মতকে স্বীকার করে নিয়েছেন। তাই মুসলমান ধর্মের প্রতি হিন্দুদের কোন বিদ্বেষ নেই। আজ যারা সাম্প্রদায়িক চেতনা দুষ্ট কুরুচি অসংস্কৃত চেতনা ও বিকশিত বুদ্ধি কিংবা জ্ঞান পাপী তারাই “মালাউন” শব্ধটির অপব্যবহার করে। অন্য ধর্মাবলম্বী বা মানুষের হৃদয়ে ব্যাথার উদ্রেগ করে এমন শব্ধ ব্যবহার করা কোন ধর্মেই স্বৃকীত নয়। আরবী ভাষায় রাজাকার শব্ধের অর্থ স্বেচ্ছাসেবক কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় স্বাধীনতার বিরোধীতা ও খুন, ধর্ষনের মত ঘৃন্য অপরাধ করার জন্য রাজাকার শব্ধটি আজ গালি হিসাবে পরিনত হয়েছে। তদরুপ “আলবদর” “আলশামস” শব্ধ দু‘টির ক্ষেত্রেও অনুরূপ মন্তব্য করা যায়। ১৯৭১ সালে যে বীভৎসরূপে তীব্রতম ঘৃনায় রক্তলোলপ জিঘাংসায় হিন্দুদের প্রতি “মালাউন” শব্ধটি উচ্চারিত হত তা আজ মনে পরলে পাকবাহিনী ও তার দোসরদের প্রতি ঘৃনা জাগরিত হয়। যা অনুভুতি সম্পন্ন বিবেকবান মানুষের পক্ষে ভোলা সম্বব নয়। তাই সুশিক্ষিত, অসাম্প্রদায়িক, মুক্তচেতনার ধারক, আধুনিক মানুষের পক্ষে কোন ভাবেই “মালাউন” শব্ধের অপপ্রয়োগ শুধু অসম্ববই নয় অভাবনীয়ও বটে।

ব্রেকিং নিউজঃ