| |

১৭ই ফেব্রয়ারী সাবেক এমপি মরহুম আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ এর মৃত্যু দিবস আজীবন প্রতিবাদী বরেণ্য রাজনীতিবিদ ছিলেন মরহুম আলতাফ হোসেন গোলন্দাজর

আপডেটঃ 7:25 pm | February 14, 2017

Ad

মো: নাজমুল হুদা মানিক ॥ ১৭ই ফেব্রয়ারী সাবেক এমপি মরহুম আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ এর মৃত্যু দিবস। আজীবন প্রতিবাদী একজন মানুষের চলে যাওয়া গফরগাঁও তথা দেশের মানুষ সহজ ভাবে মেনে নিতে পারেনি। হৃদয়ের প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে অনেকেই হয়েছিল দিশেহারা। মহান আল্লাহতালার ইচ্চায় সময়ের পথ পরিক্রমায় একদিন থেমে যায় এই মহান ব্যক্তির কর্মকোলাহল। সকল মানুষের জন্য মৃত্যু অনিবার্য, মৃত্যুই সত্য। মৃত্যুর মধ্য দিয়েই গফরগাঁও এর কিংবদন্তী নেতা আলতাফ হোসেন গোলন্দাজের কর্ম জীবনের পান্ডুলিপি সমাপ্ত হলেও লক্ষ মানুষের মনে রয়ে গেছে হাজারও স্মৃতি। চিরাচরিত নিয়মে জগত সংসারে পড়ে থাকে মানুষের কর্ম। আর সেই কর্ম যদি হয় মহৎ কল্যাণকর, তাহলে সেই মানুষ হয় ইতিহাস, তার অমরত্বের  আলোকরশ্মি ছড়ায় যুগ যুগান্তর ধরে। জননেতা আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ তেমনি একটি নাম, একটি ইতিহাস। ইতিহাসের এক অংশ মহৎকর্ম তাকে করেছে মহিমান্বিত। আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ ইহকাল থেকে চলে গেলেও তিনি রয়ে গেছেন সকলের মনে। তিনি আজ সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে গ্রহণীয়, বরণীয় অমর ব্যক্তিত্ব। আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও থানার নিগুয়ারী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নিগুয়ারী তার নানার বাড়ী। তাঁর পিতার নাম মরহুম রোস্তম আলী গোলন্দাজ। তারা ছিলেন তিন ভাই। সবার বড় ছিলেন তিনি। অন্য দুই ভাই হলেন মরহুম ইকবাল হোসেন গোলন্দাজ রতন, মরহুম ইমামুল হোসেন গোলন্দাজ মানিক। তার স্ত্রীর নাম মাহফুজা গোলন্দাজ। তিনি দুই ছেলে এবং এক কন্যা সন্তানের জনক। তাদের একজন ছিলেন মরহুম ফুয়াদ গোলন্দাজ জগলু ও অপরজন ময়মনসিংহ-১০ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য ফাহমি গোলন্দাজ বাবেল। মেয়ে আঞ্জুম গোলন্দাজ। আলতাফ হোসেন গোলন্দাজের আদি পুরুষ ছিলেন পারস্যের অধিবাসী। তারা মোগল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবরের সাথে ভারতবর্ষে আগমন করেন। পরবর্তীতে মোগল সম্রাজ্যের বিস্তৃতির সাথে সাথে পারস্য জাতির বিভিন্ন গোত্র উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। বাবরের গোলন্দাজ বাহিনীর কোন এক গোত্র পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে স্থায়ী ভাবে বসতি স্থাপন করে। পরে তাদের কেউ কেউ বাংলার নবাবের অধীনে চাকুরী গ্রহণ করেছিলেন। তারা ছিলেন কর্তব্যপরায়ণ স্বাধীনতাপ্রিয় বীরযোদ্ধা। তাই বংশানুক্রমে নবাবের গোলন্দাজ বাহিনীতে তাদের স্থায়ী আসন রক্ষিত হয়। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উ-দৌল্লার সাথে যখন রাজদরবারের সবাই বিশ্বাসঘাতকতা করে ইংরেজদেরকে সমর্থন করে, সেই দুর্দিনে নবাবের পক্ষে ছিলেন এই গোলন্দাজ বাহিনী। পলাশীর আম্রকাননে নবাবের পক্ষ হয়ে দেশপ্রেমিক মোহনলাল ও মীর মর্দান যখন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন মীর মর্দানের অধীনস্ত এই গোলন্দাজ বাহিনীর সদস্যরাও যুদ্ধের ময়দানে ছিলেন। তারা নবাবের সাথে বেঈমানী করেননি। যুদ্ধ পরাজিত হয়ে তারাও ষড়যন্ত্রকারী মীর জাফর ও ইংরেজদের কোপানলে পড়েন। তাই জীবন বাচানোর তাগিদেই ভাগ্যান্বেষনে তারা মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পূর্ববাংলায় চলে আসেন। অত:পর গোত্রের বিভিন্ন লোক বিভিন্ন দিক ছড়িয়ে পড়েন। একটি দলের সর্দার পীর মাহমুদ গোলন্দাজ ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও থানার বাগুয়া গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। তখন এই বাগুয়া ছিল হিংস্র জীব জন্তুতে ভরপুর নির্জন বনভূমি পীর মাহমুদ গোলন্দাজকে মুগ্ধ করেছিল। তার যুদ্ধপ্রিয় মন এই নির্জন প্রকৃতির সাথে সংগ্রামের নতুন পথ খোঁজে পেয়েছিলো। এখানেই তিনি স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। এখান থেকেই বর্তমান গোলন্দাজের গোড়া পত্তন। পীর মাহমুদ গোলন্দাজের ছেলে বারহামদী গোলন্দাজ, বারহামদী গোলন্দাজের ছেলে ইনসান আলী গোলন্দাজ, ইনসান আলী গোলন্দাজের ছেলে রোস্তম আলী গোলন্দাজ আর রোস্তম আলী গোলন্দাজের ছেলে আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ। ছাত্র জীবনে আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। তিনি জগন্নাথ কলেজ থেকে বি.এ.পাস করেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলায় ছিলেন বেশ পারদর্শী। কৈশোর থেকেই দুরন্ত গোলন্দাজ অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন। সততা ছিল তার সঙ্গী। অন্যায়ের সাথে, অসত্যের সাথে, অকল্যাণের সাথে জীবনে কখনো কোন আপোষ করেননি তিনি। সোনার চামচ মুখে নিয়ে তিনি জন্মে ছিলেন। তৎকালীন সময়ে কোটিপতি পিতার ঘরে জন্ম নিলেও ধন সম্পত্তি, বিত্ত বৈভব প্রাচুর্য তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। অতি সাধারণ, সাদামাটা জীবন বেছে নিয়ে ছিলেন তিনি। নিজের সুখ নয়,দেখতে চেয়ে ছিলেনে মানুষের সুখ। গরীব দুঃখী অসহায়, নির্যাতিত নিপীড়িত বঞ্চিত মানুষের সুখ। স্বীয় মহৎকর্মের ভেতর দিয়ে তিনি রচনা করতে চেয়েছিলেন একটি শান্তিময় উদ্যান। তিনি মানুষকে ভালবেসেছেন এবং মানুষের ভালবাসাও পেয়েছেন। ছাত্র জীবনেই তিনি জড়িয়ে পড়েন রাজনীতির সঙ্গে।তার রাজনৈতিক যাত্রা সূচিত হয় ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি দিয়ে। তিনি ১৯৬৯ সালে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে গফরগাঁও কলেজ ছাত্র সংসদেরে ভি.পি. নির্বাচিত হন। পরবর্তী রাজনৈতিক পথ পরিক্রমায় তিনি যুক্ত হন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগে যোগদানের মাধ্যমে। ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে তিনি আওয়ামীলীগে যোগদান করেন । ১৯৮৯ সালে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) থেকে তিনবার নির্বাচিত সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য সকলের জনপ্রিয় নেতা মরহুম আলহাজ্ব আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ। আজ আমরা হারিয়েছি এমন একজন সাহসী রাজনৈতিক সৈনিককে যিনি কোন দিন মাথা নত করেননি আধিপত্যবাদ ও গোষ্টিতন্ত্রের কাছে। তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে একজন নির্ভীক সুর্য সৈনিক। রাজনীতি কিংবা প্রশাসনিক সর্বক্ষেত্রেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন প্রতিবাদী কন্ঠস্বর। নিজ দল আওয়ামীলীগ কিংবা সামাজিক যেকোন ক্ষেত্রেই স্বৈরাচার, স্বেচ্ছাচার, কিংবা একনায়কতন্ত্রী যেকোন নেতা কিংবা ব্যক্তির বিরুদ্ধে নির্ভীক ভাবে প্রতিবাদ করেছেন যা আজও স্মরনীয় হয়ে আছে জনগনের মাঝে। ৭৫ পরবর্তী সময়ে ময়মনসিংহ জেলা ও উনার নিজ এলাকা গফরগাঁয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের যে কজন নেতা জীবনবাজি রেখে লড়াই সংগ্রাম করে গেছেন তাদের মধ্যে আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ ছিলেন অন্যতম।সেই সময়ে ঢাকায় কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের যতগুলি সভা সমাবেশ হয়েছে আলতাফ হোসেন গোলন্দাজের নেত্বত্বে মিছিল হতো সর্ববৃহৎ। শত বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ হাজার হাজার দলীয় নেতাকর্মী ও জনতাকে সাথে নিয়ে উপস্থিত হতেন সেই ঢাকা ও ময়মনসিংহের সমস্ত সমাবেশে। নেতা কর্মীদের যাতায়ত ও খাবারের ব্যবস্থা করতেন নিজ খরচে। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে অনেক সময় বলতে শুনাগেছে “আমার গোলন্দাজ বাহিনী কই, মিছিল দেখলেই বলতেন আমার গোলান্দাজ বাহিনী এসে গেছে।”প্রত্যক্ষদর্শীরা আজও সেই কথা গুলো স্মরন করেন। গফরগাঁও এর আলতাফ হোসেন গোলন্দাজের নেতৃত্বে জননেত্রী শেখ হাসিনার ময়মনসিংহের সার্কিট হাউজ মাঠে জনসভায় যোগ দিতে আসা নেতাকর্মীদের মিছিল থেকে শোনা যেতো “কি দেখাইলা আলতাফ  ভাই, সার্কিট হাউজে জায়গা নাই, ময়মনসিংহে জায়গা নাই।” তৎকালীন স্মরণকালের সর্ববৃহৎ মিছিলটিতে এত বেশী নেতাকর্মী অংশ গ্রহন করেছিলো যে রেলওয়ে স্টেশন থেকে সার্কিট হাউজ মাঠ পর্যন্ত বিস্তৃতি ছিলো মিছিল। সেদিন তিল ধারনের জায়গা ছিলোনা ময়মনসিংহ শহরের রাস্তা ঘাট অলিগলিতে। ঠাই দাঁড়িয়ে থেকে নেতাকর্মীরা স্লোগান দিয়েছিল “কি দেখাইলা আলতাফ ভাই, ময়মনসিংহে জায়গা নাই”। এই কথাগুলোর দ্বারা প্রমাণিত যে তিনি কত বড় সাংগঠনিক মাপের নেতা ছিলেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহ বাসী অবাক বিস্ময়ে দেখেছেন এসব। যার নেতৃত্বে হাজার হাজার নেতা কর্মী গফরগাঁও থেকে ঢাকা কিংবা ময়মনসিংহের আওয়ামীলীগের জনসভায় যোগ দিতো। আজকের দিনে যেমন বাস ট্রাক বন্ধ থাকলে বোঝা যায় হরতাল হচ্ছে সেই সময়ে ট্রেন বন্ধ থাকলে বোঝা যেতো হরতাল চলছে। সরকার বিরোধী আন্দোলনে আমরা তখন দেখতাম ঢাকা থেকে ট্রেন ছেড়ে আসলেও মশাখালি কিংবা গফরগাঁও স্টেশনে এসে ট্রেন আটকে যেতো। আর এব্যাপারে যিনি স্বশরীরে রেল লাইনের উপরে দাঁড়িয়ে ট্রেন আটকে দিতেন তিনি গফরগাঁও তথা ময়মনসিংহের প্রিয় নেতা আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ। ২০০১ সালে যখন বিএনপি জোট সরকারের নির্যাতনে গফরগাঁও তথা সারাদেশে আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীরা বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হচ্ছিলো, তখন এই মহান সাহসী নেতা নিজে মাইকিং করেছেন জননেত্রী শেখ হাসিনার গফরগাঁও আগমন উপলক্ষে প্রোগামের। আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ আওয়ামীলীগের জেলা কমিটির মিটিংয়ে যেকোন অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্ভীক একজন নেতা হিসাবে প্রতিবাদ করতেন। তখনকার সময় যারা ছাত্রলীগ কিংবা যুবলীগের সাথে যুক্ত ছিলেন সাংগঠনিক কারণে যদি উনার সফরসঙ্গী হতেন তাহলে তাদের খাওয়া দাওয়া ও যাতায়তের ব্যবস্থা করতেন প্রিয় নেতা আলতাফ গোলন্দাজ। তিনি ছিলেন একজন নির্ভীক ন্যায়পরায়ন, সৎ ও কর্মীবান্ধব নেতা। উনার কাছের লোকও কোন অন্যায় করলে তিনি সবকিছুর উর্ধ্বে উঠে ন্যায় বিচার করতে পিছ পা হতেন না। তাই তিনি ছিলেন গফরগাঁও এর জনগনের কাছে সর্বজন শ্রদ্ধেয় একজন রাজনৈতিক নেতা। ধনী গরীব নির্বিশেষে সবাই তাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন, যার নজীর পাওয়া যায় উনার জানাযায় লক্ষ লক্ষ শোকার্ত মানুষের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে। যেকোন রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় প্রতিপক্ষের প্রথম আঘাত আসত উনার উপর। উনি অত্যান্ত সাহসিকতার সহিত নির্ভয়ে তা মোকাবেলা করতেন। উনি জীবনে বহুবার রাজনৈতিক কারনে কারা বরন করেছেন। উনি নেতাকর্মী সাধারণ জনসাধারণকে ভালোবাসতেন গভীর ভাবে। সেই সময় থেকেই উনার মত নির্ভীক নেতা খুব কমই ছিল। আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ এমপি ছিলেন জনপ্রিতার শীর্ষে। নির্বাচনে বিরোধী পক্ষ প্রচুর টাকা খরচ করে ও উনার জনপ্রিয়তার কাছে বার বার হেরে গেছে। প্রখর স্মৃতি শক্তি সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন তিনি। টোক থেকে রসুলপুর পর্যন্ত প্রত্যেকটি গ্রামের প্রতিটি বাড়ি সমন্ধে ধারণা রাখতেন তিনি। হাজার হাজার নেতা কর্মীকে চিনে নাম ধরে ডাকতে পারতেন। কিশোর,যুবক,বৃদ্ধ সবাইকে একচোখে দেখতেন ও মূল্যায়ন করতেন। গফরগাঁয়ের প্রত্যন্ত এলাকার কোন নেতাকর্মী মারা গেলে জানাযায় অংশ গ্রহণ করতেন। পার্টি অফিসে সময় দিতেন প্রচুর।একজন নেতাকর্মী থাকতেও তিনি উঠে যেতেন না। সবার সমস্যা,অভাব অভিযোগের কথা মনোযোগ ও ধৈর্য সহকারে শোনে নিজে সমাধানের চেষ্টা করতেন নতুবা কোন নেতাকে দায়িত্ব দিতেন। উনার কাছে বসলে উঠতে চাইতো না। দিকনির্দেশনা ও উপদেশমূলক সারগর্ভ কথা বলতেন তিনি। নিজেকে তিনি জনগণের নগন্য খাদেম হিসেবে পরিচয় দিতেন। কোন লোক যদি উনার পায়ে কদমবুসি করতে আসতেন উনি তা করতে দিতেন না। তিনি প্রায় সময় বক্তৃতায় বলতেন “২০ হোন্ডা ৪০ গুণ্ডার রাজনীতি আমি করিনা”। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো উনি নিজে নিজেই নিতেন,উনার রাজনীতিতে সেকেন্ড ইন কমাণ্ড কেউ ছিলনা। আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ বহুগুণে গুনান্বিত ছিলেন।তাঁর বহুমুখী প্রতিভা ও গুণের কথা এই স্বল্প পরিসরে প্রকাশ করা সম্বব হবেনা। গফরগাঁওয়ের সাহিত্যিক ও লেখকগন কিংবদন্তী নেতা আলহাজ্ব আলতাফ হোসেনকে নিয়ে কিছু লেখা বা বই আকারে প্রকাশ করে তাকে স্মরনীয় করে রাখবেন এটিই সকলের প্রত্যাশা। যাতে করে উনি সমাজের মাঝে ও ভবিষ্যত প্রজন্মের মাঝে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন। কোন অনুষ্ঠান,সভা,সমিতিতে দাওয়াত দিলে তিনি নিজে যাওয়া চেষ্টা করতেন, কোন প্রতিনিধি পাঠাতেন না। আলতাফ গোলন্দাজ ছিলেন ধর্ম ভীরু। বিভিন্ন ইসলামী সম্মেলনে উনাকে দাওয়াত দিলে উনি উপস্থিত হতেন এবং ইসলামিক কথাবার্তা বলতে পারতেন। মসজিদ ও মাদরাসায় দান করতেন মুক্ত হস্তে। সন্ত্রাসী কার্যকলাপ মারাত্মক ভাবে অপছন্দ করতেন। উনাকে অন্য নেতাদের সঙ্গে তুলনার চেষ্টা করলে তিনি তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতেন। আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ কত বড় মাপের নেতা ছিলেন, তাঁর কাছে না আসলে বোঝা যেতোনা। বিরোধী পক্ষের লোকের কাজ করে দিতেন সবার আগে। অতীতে উনার মতো এতো বড় মাপের নেতা গফরগাঁয়ে ছিলনা, এবং ভবিষ্যতে হবে না বলে অনেকে মনে করেন। আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ আধুনিক গফরগাঁয়ের রূপকার,উন্নয়নের জনক। তিনি পশ্চাৎপদ গফরগাঁওকে নিজের মতো করে সাজিয়েছেন। রাজধানী ঢাকা কিংবা জেলা শহর ময়মনসিংহের সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল ট্রেন। পাশাপাশি থানা সদরের সাথে বিভিন্ন ইউনিয়নের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক।এই অবস্থা তাকে দারুভাবে ভাবিয়ে তুলেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন এই নাজুক অবস্থা থেকে গফরগাঁওবাসীকে মুক্তি দিতে। তিনি হাত দিলেন এবং তার হাতের ছোঁয়ায় সেদিনের গফরগাঁও আর আজকের গফরগাঁয়ের মাঝে সূচিত হল আকাশ পাতাল ব্যবধান। উন্নয়নের যাদু স্পর্শে রঙিন হলো গফরগাঁও। যোগাযোগের ক্ষেত্রে তিনি যে বিপ্লব আনয়ন করলেন, তা গফরগাঁওবাসী যুগের পর যুগ মনে রাখবে। আজকের উত্তর গফরগাঁও, দক্ষিণ গফরগাঁও কিংবা দেশের যে কোন স্থানের সাথে যোগাযোগের জন্য এতদঞ্চলের মানুষকে আর ভাবতে হয় না। তিনি ছিলেন শিক্ষানুরাগী এক বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। যোগাযোগের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রেও এক অনন্য সফল বিপ্লব আনেন তিনি। শিক্ষানুরাগী হিসাবে তৎকালীন সরকার তাকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য নির্বাচিত করেছিল। শিক্ষার আলো ছড়ানোর লক্ষে তার পিতা মরহুম রোস্তম আলী গোলন্দাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রোস্তম আলী গোলন্দাজ উচ্চ বিদ্যালয়, জে.এম সিনিয়র ফাযিল মাদ্রাসা তাছাড়াও বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত স্কুল, কলেজ,মাদ্রাসা,মসজিদ নির্মানেও তার ভূমিকা ছিল। যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান হিসেবে তিনি একক দান,ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নিজস্ব জমির উপর প্রতিষ্ঠা করেছেন আলতাফ গোলন্দাজ ডিগ্রী কলেজ। কলেজটি শিক্ষার আলো বিস্তারের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে এবং সর্বমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। একক দান ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আলতাফ গোলন্দাজ ডিগ্রী কলেজ প্রতিষ্ঠা করলেও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠা,অবকাঠামোগত উন্নয়ন,শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ আনয়ন ,নকলমুক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা ইত্যাদি ক্ষেত্রে তার ভূমিকা সর্বজনবিদিত। গফরগাঁও মহিলা কলেজ অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।এক পর্যায়ে কলেজটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। আলতাফ হোসেন গোলন্দাজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কলেজটি পূর্ণাঙ্গ কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। কাওরাইদ গয়েশপুর কলেজ প্রতিষ্ঠয় তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। কলেজের নামে তিন জমি দান করেছেন এং পূর্ণাঙ্গ কলেজের স্বীকৃতি আনয়নে রেখেছেন অসামান্য ভূমিকা। গফরগাঁও উপজেলার এমন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই, যেখানে তার হাতের উন্নয়নের স্পর্শ লাগেনি। গরীব ও মেধাবী ছাত্র ছাত্রীদের পড়ালেখার গতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে নিজস্ব অর্থায়নে বৃত্তির ব্যবস্থা করেন তিনি। ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তারে তিনি ছিলেন অনন্য সাধারণ একজন ধর্মভীরু মানুষ হিসাবে তিনি গফরগাঁওয়ে অসংখ্য মসজিদ, মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন । আলেম ওলামাদের প্রতি তার ছিল অগাধ শ্রদ্ধাবোধ। একজন অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি হিসাবেও তার রয়েছে সুনাম। সকল ধর্মের,সকল বর্ণের মানুষের প্রতি ছিল তার প্রগাঢ় ভালবাসা। একদিন অবক্ষয়ের আচ্ছন্ন ছিল গফরগাঁওয়ের সমাজ ব্যবস্থা। নানাবিধ অসামাজিক কাজ, কুসংস্কার ও ব্যভিচারে আচ্ছন্ন ছিল গফরগাঁওয়ের মানুষ। মদ,জুয়া, হাউজি আর অবাধ নৃত্যের লীলাক্ষেত্র ছিল গফরগাঁও। জাতির অহংকার যুবসম্প্রদায় ছিল হতাশাগ্রস্থ। নৈতিক অবক্ষয় তাদেরকে জীবন থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থা থেকে গফরগাঁওকে রক্ষা করেন আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ। তিনি এম.পি নির্বাচিত হয়ে প্রথমেই গফরগাঁও থেকে মদ, জুয়া, হাউজিসহ সকল অসামাজিক কাজ নিষিদ্ধ করেন। তিনি আমৃত্য ঘুমকে হারাম করে, নিজের সুখ শান্তি বিসর্জন দিয়ে মানুষের সেবা করেছেন,মানুষের কল্যাণের কথা ভেবেছেন, এলাকার উন্নয়ন করেছেন,সামাজিক অবক্ষয় থেকে সমাজকে রক্ষা করেছেন। শান্তিকামী সংগ্রামী এই মহান পুরুষ সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে গত ২০০৭ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারী চলে গেলেন চিরন্তন সত্যের ঠিকানায়। তিনি চলে গেলেও জনসাধারনের মন থেকে মুছে যাননি। স্বীয় মহৎকর্মের জন্যে বেচেঁ আছেন, বেচেঁ থাকবেন যুগ যুগান্তর।

ব্রেকিং নিউজঃ